শিক্ষা
ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের হলের একই রুম থেকে একসাথে জজ হলেন তিন বন্ধু

বিশ্ববিদ্যালয়ের আবাসিক হলের একটি সাধারণ কক্ষ। সেখানে পাশাপাশি থাকা তিন তরুণের একটি স্বপ্ন ছিল একদিন বিচারক হবেন। স্বপ্নটা ছিল একই, পথটাও ছিল একই। তাই প্রতিযোগী না হয়ে তারা হয়ে উঠেছিলেন একে অন্যের শক্তি।
ভোরে ঘুম থেকে উঠে নামাজ আদায়, এরপর পড়ার টেবিলে বসা। দিনের ব্যস্ততার ফাঁকে একসঙ্গে খাবার খাওয়া আর রাতে নির্দিষ্ট সময়ে বসে গ্রুপ স্টাডি-এভাবেই কেটে গেছে তাদের বিশ্ববিদ্যালয়জীবনের গুরুত্বপূর্ণ সময়। সেই স্বপ্ন আর পরিশ্রমের গল্প এখন সাফল্যের নতুন এক অধ্যায় লিখেছে ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের (ইবি) সাদ্দাম হোসেন হলের ৪২২ নম্বর কক্ষের তিন রুমমেটের।
তারা হলেন ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের ২০১৭-১৮ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী আরিফ হোসাইন, অ্যাডভোকেট শাকির আলম ও আনোয়ার হোসেন। তিন সহপাঠী একই কক্ষে থেকে একসঙ্গে প্রস্তুতি নিয়েছেন বাংলাদেশ জুডিশিয়াল সার্ভিসের জন্য। তাদের মধ্যে আরিফ হোসাইন ১৬তম বাংলাদেশ জুডিশিয়াল সার্ভিস পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে বিচারক হন। এবার ১৮তম বাংলাদেশ জুডিশিয়াল সার্ভিস পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে সেই সাফল্যের তালিকায় যুক্ত হয়েছেন একই কক্ষের শাকির আলম ও আনোয়ার হোসেন। বুধবার (২৩ সেপ্টেম্বর) সন্ধ্যায় বাংলাদেশ জুডিশিয়াল সার্ভিস কমিশন সচিবালয়ের ওয়েবসাইটে ১৮তম জুডিশিয়াল সার্ভিস পরীক্ষার ফল প্রকাশের পরই সামনে আসে একই কক্ষের তিন রুমমেটের এই অনন্য সাফল্যের গল্প।
তবে এই গল্পের শুরুটা ফল প্রকাশের দিনে নয় বরং বহু বছর আগে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম বর্ষে। আইন বিভাগে ভর্তি হওয়ার পর থেকেই তিন বন্ধুর লক্ষ্য ছিল স্পষ্ট-আইন পড়বেন এবং নিজেদের প্রস্তুত করে একদিন সিভিল জজ হবেন। সেই লক্ষ্যকে সামনে রেখে তারা বেছে নেন একই কক্ষ। সাদ্দাম হোসেন হলের ৪২২ নম্বর কক্ষ হয়ে ওঠে তাদের পড়াশোনা, পরিকল্পনা, স্বপ্ন আর পরিশ্রমের ঠিকানা। আনোয়ার হোসেন বলেন, ‘ফার্স্ট ইয়ার থেকেই আমরা তিনজন দৃঢ়প্রতিজ্ঞ ছিলাম। ল’-তে চান্স পেয়েছি। তাই আমাদের মেইন টার্গেট ছিল সিভিল জজ হওয়া। তাই আমরা তিনজন সাদ্দাম হোসেন হলের ৪২২ নম্বর রুমে উঠি।’
তিনজনের দিন শুরু হতো নিয়ম মেনে। সকালে ঘুম থেকে উঠে নামাজ পড়ে পড়াশোনা শুরু করতেন তারা। এরপর একইসঙ্গে নাশতা, দুপুরের খাবার ও রাতের খাবার খাওয়া ছিল তাদের অভ্যাস। দিনের শেষে নির্দিষ্ট সময়ে বসতেন গ্রুপ স্টাডিতে। কারও কোনো বিষয় বুঝতে সমস্যা হলে অন্যরা সহযোগিতা করতেন। কেউ কাউকে টপকে যাওয়ার চেষ্টা করেননি বরং একজনের প্রস্তুতি যেন অন্য দুজনের প্রস্তুতিকেও এগিয়ে নেয়- ছিল সেই চেষ্টা। তাদের কাছে সাফল্য ছিল একার কোনো অর্জন নয়, ছিল তিন বন্ধুর সম্মিলিত স্বপ্ন।
সেই বন্ধুত্বের সবচেয়ে বড় পরীক্ষা আসে যখন আরিফ হোসাইন ১৬তম জুডিশিয়াল সার্ভিস পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে বিচারক হন। একই কক্ষের একজন যখন কাঙ্ক্ষিত গন্তব্যে পৌঁছে গেলেন, তখন অন্য দুজনের সামনে ছিল নতুন করে নিজেকে প্রমাণ করার চ্যালেঞ্জ। কিন্তু বন্ধুর সাফল্য তাদের ভেঙে দেয়নি বরং আরও দৃঢ় করেছে। আরিফের সাফল্য শাকির ও আনোয়ারের কাছে হয়ে ওঠে- ‘আমরাও পারব’ এই বিশ্বাসের সবচেয়ে বড় প্রমাণ। তারা নতুন উদ্যমে প্রস্তুতি শুরু করেন। শেষ পর্যন্ত সেই অধ্যবসায়ের ফল আসে ১৮তম জুডিশিয়াল সার্ভিস পরীক্ষার ফলাফলে। শাকির আলম ও আনোয়ার হোসেনও উত্তীর্ণ হন সিভিল জজ হিসেবে।
তিন বন্ধুর এই গল্প শুধু তিনজনের চাকরি পাওয়ার গল্প নয়। এটি একই স্বপ্নে বিশ্বাস করা তিন তরুণের বন্ধুত্ব, পারস্পরিক সহযোগিতা ও অধ্যবসায়ের গল্প। যে আবাসিক হলকে অনেকেই শুধু আড্ডা কিংবা কোলাহলের জায়গা হিসেবে দেখেন, সেই হলেরই একটি কক্ষ থেকে তারা প্রমাণ করেছেন- পরিবেশের চেয়েও বড় হলো নিজের লক্ষ্য, আর প্রতিকূলতার চেয়েও শক্তিশালী হলো ইচ্ছাশক্তি। বিশ্ববিদ্যালয়ের হলের একটি সাধারণ কক্ষেও যে বড় স্বপ্ন দেখা যায়, সেই স্বপ্নকে নিয়মিত পরিশ্রমে বাস্তবে রূপ দেওয়া যায়- সাদ্দাম হোসেন হলের ৪২২ নম্বর কক্ষ তারই জীবন্ত উদাহরণ।
আজ সেই কক্ষের গল্পে যোগ হয়েছে তিনটি সাফল্যের নাম। একই কক্ষে পাশাপাশি থাকা তিন সহপাঠী এখন বিচারকের আসনে বসার অপেক্ষায়। তাদের পথচলা যেন বলে-বন্ধুত্ব যদি প্রতিযোগিতাকে সহযোগিতায় বদলে দেয়, স্বপ্ন যদি পরিকল্পনায় রূপ নেয় আর পরিকল্পনার সঙ্গে যদি যুক্ত হয় নিরলস পরিশ্রম, তাহলে একটি ছোট কক্ষ থেকেও শুরু হতে পারে আকাশছোঁয়া সাফল্যের গল্প।
ডিবিসি/এসভিএন