ডিবিসি নিউজdbcnews.tv

শিক্ষা

যমজ সন্তান আর সংসার সামলে বিজেএস মেধাক্রমে ২৪তম ইবির শারমীন

যমজ সন্তান আর সংসার সামলে বিজেএস মেধাক্রমে ২৪তম ইবির শারমীন

শিক্ষা

যমজ সন্তান আর সংসার সামলে বিজেএস মেধাক্রমে ২৪তম ইবির শারমীন

ইবি প্রতিনিধি

ডিবিসি নিউজ

৫ ঘন্টা আগে

বিশ্ববিদ্যালয়ের শ্রেণিকক্ষে খুব বেশি কথা বলতেন না তিনি। শান্ত স্বভাবের কারণে সহপাঠীদের অনেকেই হয়তো তাকে খুব কাছ থেকে চিনতেনও না। অথচ নীরবে, নিজের মতো করে জীবনের সবচেয়ে কঠিন লড়াইটাই চালিয়ে যাচ্ছিলেন ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের (ইবি) আইন বিভাগের ২০১৭-১৮ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী শারমীন খাতুন। কুমারখালীর এই মেয়েটিই এবার ১৮তম বাংলাদেশ জুডিশিয়াল সার্ভিস (বিজেএস) পরীক্ষায় মেধাক্রমে ২৪তম হয়ে সিভিল জজ পদে সুপারিশপ্রাপ্ত হয়েছেন।

বুধবার (২৩ সেপ্টেম্বর) ১৮তম বিজেএস পরীক্ষার চূড়ান্ত ফল প্রকাশ করা হয়। এতে সারাদেশ থেকে ২০০ জন প্রার্থীকে সাময়িকভাবে মনোনয়ন দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন অনুষদের ১৯ জন শিক্ষার্থী রয়েছেন। তাদের মধ্যে আইন বিভাগের ১৪ জন, আইন ও ভূমি প্রশাসন বিভাগের চারজন এবং আল-ফিকহ অ্যান্ড ল বিভাগের একজন শিক্ষার্থী রয়েছেন।

 

তবে ইবির এই ১৯ জনের সাফল্যের ভিড়ে শারমীনের গল্পটি যেন একটু আলাদা। কারণ তার পথটা শুধু পরীক্ষার প্রস্তুতি, বই আর পড়ার টেবিলের গল্প নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে সংসার, মাতৃত্ব এবং নিজের স্বপ্নকে বাঁচিয়ে রাখার এক দীর্ঘ লড়াই।

 

২০১৫ সালে এসএসসি পরীক্ষা শেষ করার পর ২০১৬ সালে বিয়ে হয় শারমীনের। এরপর ২০২১ সালে তিনি জন্ম দেন যমজ সন্তানের। একদিকে সংসারের দায়িত্ব, অন্যদিকে দুই সন্তানকে সামলানো—সবকিছুর মধ্যেই নিজের উচ্চশিক্ষার স্বপ্নটাকে ধরে রাখেন তিনি।

 

বিজেএসের প্রস্তুতির শুরুতেও সন্তান ও সংসার সামলে পড়াশোনার জন্য আলাদা সময় বের করা তার জন্য সহজ ছিল না। কিন্তু মনের জেদ তাকে থামতে দেয়নি। এমনকি ১৮তম বিজেএসের লিখিত পরীক্ষার সময়ও তার সন্তান হাসপাতালে ভর্তি ছিল। একদিকে হাসপাতালে থাকা সন্তানের জন্য মায়ের উদ্বেগ, অন্যদিকে জীবনের কাঙ্ক্ষিত স্বপ্নের পরীক্ষা—দুইয়ের মাঝখানে দাঁড়িয়েও পরীক্ষা দিতে হয়েছে তাকে।

 

শারমীনের ভাষায়, ‘২০১৫ সালে এসএসসি পরীক্ষা শেষ করার পর ২০১৬ সালে আমার বিয়ে হয়। এরপর ২০২১ সালে আমি যমজ সন্তানের মা হই। এই দীর্ঘ পথচলায় আমার স্বামী মো. আশাদুল হক ছায়াসঙ্গী হিসেবে সবসময় পাশে থেকেছে। উচ্চশিক্ষার প্রতি আমার আগ্রহকে সবসময়ই স্বামী ও শ্বশুরবাড়ির মানুষজন উৎসাহ ও সহযোগিতা করেছেন।’

 

তিনি বলেন, ‘আমার এই স্বপ্ন পূরণের পথে শিক্ষক, বন্ধুবান্ধব ও পরিবারকেও পাশে পেয়েছি। অনার্স-মাস্টার্সের গণ্ডি পেরিয়ে অবশেষে বসলাম বিজেএস পরীক্ষায়। শুরুতে বাচ্চা ও সংসার সামলে বিজেএসের প্রস্তুতির জন্য সময় বের করতে পারিনি। কিন্তু মনের জেদটা ছিল তীব্র। অবশেষে ১৮তম বিজেএসে সিভিল জজ হিসেবে সুপারিশপ্রাপ্ত হলাম।’

 

শারমীনের এই সাফল্য তাই শুধু একটি পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়ার গল্প নয়। এটি এমন একজন নারীর গল্প, যিনি সংসার করেছেন, মা হয়েছেন, সন্তানকে সময় দিয়েছেন, কঠিন সময় পার করেছেন—তবুও নিজের স্বপ্নকে হারিয়ে যেতে দেননি।

 

যে মেয়েটিকে হয়তো বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্লাসে অনেকেই নীরব আর চুপচাপ হিসেবেই চিনতেন, সেই মেয়েটিই আজ মেধাক্রমে ২৪তম হয়ে বিচার বিভাগের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে যাওয়ার পথে।

 

শারমীন বলেন, ‘যে মহান দায়িত্ব পেতে চলেছি, তা যেন নিষ্ঠা, সততা ও দায়িত্বশীলতার সঙ্গে পালন করতে পারি, এই জন্য সকলের কাছে দোয়া চাই।’

 

তার এই সাফল্যের সঙ্গে ইবির জন্যও যুক্ত হয়েছে গৌরবের আরেকটি অধ্যায়। ১৮তম বিজেএসে বিশ্ববিদ্যালয়টির ১৯ শিক্ষার্থীর সুপারিশপ্রাপ্তি আইন শিক্ষায় ইবির ধারাবাহিক সাফল্যেরই আরেকটি উদাহরণ হয়ে এসেছে।

 

আর শারমীনের গল্পটি মনে করিয়ে দেয়—জীবনের দায়িত্ব কখনো কখনো স্বপ্নের পথকে কঠিন করে দেয়, কিন্তু স্বপ্নকে থামিয়ে দেওয়ার ক্ষমতা সবসময় সেই কঠিন বাস্তবতার থাকে না। ইচ্ছাশক্তি, পরিবারের সহযোগিতা আর নিজের প্রতি বিশ্বাস থাকলে সংসার, মাতৃত্ব কিংবা প্রতিকূলতার মাঝেও মানুষ নিজের গন্তব্যে পৌঁছাতে পারে।

 

কুমারখালীর সেই শান্ত স্বভাবের মেয়েটি আজ শুধু একজন সফল পরীক্ষার্থী নন; তিনি অনেক নারীর জন্য নীরব এক অনুপ্রেরণার নাম।

 

ডিবিসি/এসডব্লিউএন

আরও পড়ুন