ডিবিসি নিউজdbcnews.tv

আন্তর্জাতিক

গাজায় ৬ কোটি ১০ লাখ টন ধ্বংসস্তূপ, নিচে চাপা পড়ে আছে ১০ হাজার মরদেহ

গাজায় ৬ কোটি ১০ লাখ টন ধ্বংসস্তূপ, নিচে চাপা পড়ে আছে ১০ হাজার মরদেহ

আন্তর্জাতিক

গাজায় ৬ কোটি ১০ লাখ টন ধ্বংসস্তূপ, নিচে চাপা পড়ে আছে ১০ হাজার মরদেহ

আন্তর্জাতিক ডেস্ক

ডিবিসি নিউজ

৪ ঘন্টা আগে

গাজা সিটির তেল আল-হাওয়া এলাকার বৈরুত স্ট্রিট। একসময় দোকানপাট, অফিস আর মানুষের কোলাহলে মুখর থাকা এই প্রধান সড়কটি এখন পুরোপুরি জনশূন্য। সড়কের একপাশে কাত হয়ে দাঁড়িয়ে আছে ক্ষতিগ্রস্ত একটি বহুতল ভবন, যার ভেতরেই ঝুঁকি নিয়ে বসবাস করছে বাস্তুচ্যুত কয়েকটি পরিবার।

ইসরায়েলি হামলায় পয়ঃনিষ্কাশন ব্যবস্থা ভেঙে পড়ায় রাস্তার ওপর দিয়েই বইছে নোংরা পানি। তীব্র গরমে সারাদিন কাজ করে এই সড়কের মাত্র একটি অংশ পরিষ্কার করতে পেরেছেন জাতিসংঘের বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচির প্রকৌশলী আহমেদ আলিয়ান। দিনশেষে চারপাশের পাহাড়সম ধ্বংসস্তূপের দিকে তাকিয়ে কপালের ঘাম মুছতে মুছতে ক্লান্ত আলিয়ান বললেন, ‘মনে হচ্ছে আমরা হাতে একটা চামচ নিয়ে পুরো সমুদ্র সেঁচে ফেলার চেষ্টা করছি।’

 

আলিয়ানের এই আক্ষেপই বলে দেয় গাজার বর্তমান পরিস্থিতি কতটা ভয়াবহ। জাতিসংঘের হিসাব অনুযায়ী, পুরো গাজা উপত্যকায় জমে থাকা ধ্বংসস্তূপের পরিমাণ প্রায় ৬ কোটি ১০ লাখ টন। আধুনিক ইতিহাসের সবচেয়ে বড় এই ধ্বংসস্তূপ অপসারণ অভিযানে সময় লাগবে অন্তত ৭ থেকে ১০ বছর, আর খরচ হবে শত শত কোটি ডলার। জাতিসংঘ উন্নয়ন কর্মসূচির (ইউএনডিপি) ফিলিস্তিন বিষয়ক বিশেষ প্রতিনিধি জ্যাকো সিলিয়ার্স জানান, গত ১৮ বছরে সারা বিশ্বের সব যুদ্ধ মিলিয়ে যে পরিমাণ ধ্বংসস্তূপ তৈরি হয়েছে, গাজার এই ধ্বংসস্তূপ তার চেয়েও প্রায় ২০ গুণ বেশি।


গত দুই বছরেরও বেশি সময়ে স্থানীয় ও আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো গাজায় ৫৮০ কিলোমিটার রাস্তা পরিষ্কার করেছে, যাতে ত্রাণবাহী ট্রাক ও উদ্ধারকারীরা চলাচল করতে পারে। এ পর্যন্ত প্রায় ৯ লাখ ৭ হাজার টন ধ্বংসস্তূপ সরানো হয়েছে এবং ৩ লাখ টনের বেশি রিসাইকেল বা পুনর্ব্যবহার করা হয়েছে। শুনতে বিশাল মনে হলেও এটি গাজার মোট ধ্বংসস্তূপের মাত্র দেড় শতাংশ।


এই কাজটি আরও কঠিন করে তুলেছে ইসরায়েলি নিষেধাজ্ঞা। খাবার ও ওষুধ ছাড়া যেকোনো সরঞ্জাম হামাসের কাজে লাগতে পারে- এমন ‘দ্বৈত ব্যবহারের’ অজুহাত তুলে গাজায় ভারী যন্ত্রপাতি ও নির্মাণসামগ্রী ঢুকতে দিচ্ছে না ইসরায়েল। তার ওপর গত অক্টোবরে শুরু হওয়া প্রায় এক বছরের যুদ্ধবিরতির মধ্যেও ইসরায়েলি হামলা অব্যাহত থাকায় প্রতিদিনই নতুন করে ধ্বংসস্তূপ জমছে। এমনকি পরিষ্কার করা রাস্তাও কয়েকবার করে নতুনভাবে পরিষ্কার করতে হয়েছে। এছাড়া যুদ্ধবিরতির সময় নির্ধারিত ‘ইয়েলো লাইন’ বা সীমানা রেখা পেরিয়ে ইসরায়েলি বাহিনী ক্রমাগত ভেতরে ঢুকে পড়ায় বর্তমানে গাজার মাত্র ৩০ শতাংশ এলাকায় মানুষ ও ত্রাণকর্মীরা প্রবেশ করতে পারছেন।


নতুন যন্ত্রপাতি ও নির্মাণসামগ্রী না পেয়ে বাধ্য হয়েই ধ্বংসস্তূপ রিসাইকেল করার পথ বেছে নিয়েছে ইউএনডিপি। সংস্থাটি গাজাজুড়ে পাঁচটি ক্রাশিং সাইট বা পাথর ভাঙার কেন্দ্র পরিচালনা করছে। যুদ্ধের আগে থেকেই গাজায় থাকা সাতটি পুরোনো ক্রাশার মেশিন দিয়ে চলছে এই কাজ, যার মধ্যে দুটি মেশিন স্থানীয় প্রকৌশলীরা নিজেরাই মেরামত করে সচল করেছেন। প্রথমে ধ্বংসস্তূপ থেকে লোহা ও রড আলাদা করা হয়, এরপর কংক্রিটগুলো ভেঙে মার্বেলের মতো ছোট ছোট টুকরো করা হয়। তবে খুচরা যন্ত্রাংশ ও ইঞ্জিন অয়েলের তীব্র সংকটে জরাজীর্ণ এই মেশিনগুলো প্রায়ই বিকল হয়ে পড়ে।


ডব্লিউএফপির প্রকৌশলী নেহাল আবু হাসান জানান, প্রাকৃতিক নির্মাণসামগ্রীর তুলনায় এই ভাঙা কংক্রিটের মান অনেক নিচু এবং এগুলো দিয়ে কাজ করাও কঠিন। কিন্তু বাস্তবতার চাপে তাদের সামনে আর কোনো বিকল্প নেই। এই কংক্রিটের টুকরোগুলো দিয়েই এখন রাস্তা মেরামত ও গর্ত ভরাট করা হচ্ছে। পাশাপাশি প্রায় তিন বছর ধরে তীব্র মানবিক সংকটের মধ্যে তাঁবুতে বসবাস করা ২১ লাখেরও বেশি বাস্তুচ্যুত মানুষের তাঁবুর নিচেও বিছানো হচ্ছে এসব পাথর, যাতে বৃষ্টির পানি ও পয়ঃনিষ্কাশনের বর্জ্য থেকে তারা কিছুটা রক্ষা পান।


সীমিত আকারে হলেও ধ্বংসস্তূপ সরানোর সুফল পাচ্ছেন স্থানীয়রা। জাবালিয়া থেকে বাস্তুচ্যুত হয়ে তেল আল-হাওয়ায় আশ্রয় নেওয়া ইব্রাহিম দারাদোনা জানান, আবর্জনা ও কংক্রিটের স্তূপ সরানোয় পোকামাকড় ও ইঁদুরের উপদ্রব কমেছে, গাড়ি চলাচল সহজ হয়েছে এবং শিশুদের খেলার জায়গাও কিছুটা নিরাপদ হয়েছে। এছাড়া ক্ষতিগ্রস্ত দোকানপাটের সামনের জঞ্জাল সরিয়ে দেওয়ার ২০ দিনের মধ্যেই অনেক ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী আবার দোকান খুলতে শুরু করেছেন, যা স্থানীয় অর্থনীতিকে কিছুটা প্রাণ দিচ্ছে।


কিন্তু গাজাবাসীর কাছে এই ধ্বংসস্তূপ কেবল ইট-পাথরের জঞ্জাল নয়, এর নিচে চাপা পড়ে আছে তাদের সারাজীবনের স্মৃতি এবং প্রিয়জনের নিথর দেহ। ইউএনডিপির ধারণা, গাজার ধ্বংসস্তূপের নিচে এখনো ৮ থেকে ১০ হাজার মানুষের মরদেহ চাপা পড়ে আছে। তাই এগুলো সরানো স্থানীয় পরিবারগুলোর জন্য অত্যন্ত সংবেদনশীল একটি বিষয়। ইউএনডিপি ও আন্তর্জাতিক রেড ক্রস কমিটি (আইসিআরসি) যৌথভাবে মরদেহগুলোর অবস্থান শনাক্ত করা, ফরেনসিক পরীক্ষার মাধ্যমে পরিচয় নিশ্চিত করা এবং ধর্মীয় মর্যাদায় দাফনের পাশাপাশি পরিবারকে মৃত্যুসনদ দেওয়ার কাজ করছে।


মরদেহের পাশাপাশি ধ্বংসস্তূপের নিচে লুকিয়ে আছে মৃত্যুফাঁদ। অবিস্ফোরিত ইসরায়েলি বোমা, ক্ষতিকর অ্যাসবেস্টসের ধুলো এবং যেকোনো মুহূর্তে ধসে পড়ার অপেক্ষায় থাকা আধা-ভাঙা ভবনগুলো উদ্ধারকর্মী ও ফিরে আসা বাসিন্দাদের জন্য বড় ঝুঁকি হয়ে দাঁড়িয়েছে। জাতিসংঘের মাইন অ্যাকশন সার্ভিস (ইউএনএমএএস) এবং ব্রিটিশ সংস্থা হ্যালো ট্রাস্টের সহায়তায় ঝুঁকিপূর্ণ এলাকাগুলো চিহ্নিত করার কাজ চলছে। তবে প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম আনার অনুমতি না থাকায় গাজাকে বসবাসের উপযোগী করার এই লড়াই চলছে অত্যন্ত ধীরগতিতে।


সূত্র: দ্য গার্ডিয়ান


ডিবিসি/ এসভিএন

আরও পড়ুন