আন্তর্জাতিক
ইউক্রেন যুদ্ধ থামার ইঙ্গিত নেই, ইউরোপের সঙ্গে বাড়ছে সংঘাতের ঝুঁকি

আইনসভা নির্বাচনে বিপুল বিজয়ের পর রাশিয়ার পার্লামেন্টে উষ্ণ অভ্যর্থনা পেয়েছেন প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন। ক্রেমলিন-নিয়ন্ত্রিত সাম্প্রতিক নির্বাচনের মাধ্যমে পুতিনপন্থী দল ‘ইউনাইটেড রাশিয়া’ পার্লামেন্টের নিম্নকক্ষ স্টেট ডুমায় নিজেদের আসনসংখ্যা আরও বাড়িয়েছে।
মস্কো এটিকে পুতিনের নীতির প্রতি রাশিয়ার জনগণের নিরঙ্কুশ সমর্থন হিসেবে প্রচার করছে। তবে পার্লামেন্টে এমন নিরঙ্কুশ নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার পর প্রশ্ন উঠছে পুতিন কি ইউক্রেনে তাঁর তথাকথিত ‘বিশেষ সামরিক অভিযান’ বন্ধের কোনো উদ্যোগ নেবেন, নাকি ইউরোপের সঙ্গে উত্তেজনা আরও বাড়িয়ে তুলবেন?
পর্যবেক্ষক ও গণমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ইউক্রেনে পূর্ণাঙ্গ আগ্রাসন থামানোর কোনো লক্ষণ ক্রেমলিনের পক্ষ থেকে দেখা যাচ্ছে না। যুদ্ধক্ষেত্রে বিপুল প্রাণহানি এবং অর্থনীতির ওপর ব্যাপক চাপ সত্ত্বেও পুতিন সামরিক বিজয়ের ব্যাপারে এখনো আত্মবিশ্বাসী।
বিশেষ করে ইউক্রেনের আকাশ প্রতিরক্ষা ক্ষেপণাস্ত্রের ঘাটতি এবং আসন্ন শীতে কিয়েভের ওপর চাপ আরও বাড়বে এমন ধারণায় মস্কো যুদ্ধ চালিয়ে যেতে উৎসাহিত হচ্ছে। ইউক্রেনের কর্মকর্তাদের মতে, প্রতিদিন আঘাত হানা রুশ ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র এবং নতুন জেটচালিত ড্রোন প্রতিহত করতে তাদের কঠিন বেগ পেতে হচ্ছে।
একই সঙ্গে ক্রেমলিন চাইছে ইউরোপীয় দেশগুলো যেন কিয়েভকে দেওয়া সামরিক ও আর্থিক সহায়তা বন্ধ করে। মস্কোর দাবি, পশ্চিমা সহায়তাই যুদ্ধকে দীর্ঘায়িত করছে। এই সমর্থন বিচ্ছিন্ন করতে রাশিয়া ইউরোপে সাইবার আক্রমণ, অন্তর্ঘাতমূলক কর্মকাণ্ড এবং আকাশসীমা লঙ্ঘনের মতো একটি গোপন ‘হাইব্রিড যুদ্ধ’ বা ছায়াযুদ্ধ চালাচ্ছে বলে অভিযোগ পশ্চিমা দেশগুলোর।
তবে পশ্চিমা অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করে পাল্টা বক্তব্য দিয়েছেন রাশিয়ার পররাষ্ট্রমন্ত্রী সের্গেই ল্যাভরভ। এক সাক্ষাৎকারে তিনি দাবি করেন, সংঘাতের মূল হোতা ইউরোপ নিজেই। ল্যাভরভ বলেন, ‘আমাদের ওপর হামলা চালাতে ব্রিটেন ও ইউরোপের সরবরাহ করা ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র ধ্বংস করাকে আপনারা যা খুশি বলতে পারেন। তবে এটি স্পষ্ট যে, ইউরোপই আমাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ চালাচ্ছে।’ তিনি আরও স্বীকার করেন যে, মস্কোর প্রতি সরাসরি হুমকি নির্মূল করতে ইউক্রেনে ‘পাশবিক শক্তি’ প্রয়োগ করছে রাশিয়া।
ইউরোপের জন্য আরও মারাত্মক বার্তা দিয়েছেন রাশিয়ার পররাষ্ট্র ও প্রতিরক্ষা নীতি পরিষদের সাম্মানিক সভাপতি ও শীর্ষ কৌশলবিদ সের্গেই কারাগানভ। তিনি সতর্ক করে বলেন, ‘ইউরোপ যদি ইউক্রেনকে সহায়তা দেওয়া অব্যাহত রাখে, তবে অচিরেই সংঘাত তীব্র আকার ধারণ করবে। প্রথম ধাপের আক্রমণ হয়তো প্রচলিত অস্ত্র দিয়ে হবে, তবে তারা আত্মসমর্পণ না করলে রাশিয়া পারমাণবিক হামলার পথ বেছে নেবে।’ এমনকি তিনি দাবি করেন, যুক্তরাজ্য বা যুক্তরাষ্ট্র কখনোই পারমাণবিক হামলার পাল্টা জবাব দেওয়ার সাহস পাবে না।
যুদ্ধক্ষেত্রে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির কথা স্বীকার করে কারাগানভ বলেন, ‘আমরা অনেক মানুষ হারিয়েছি, তবে এখন আমরা যথেষ্ট কঠোর। ইউক্রেনকে একটি কার্যকর রাষ্ট্র হিসেবে অস্তিত্বহীন করে দেওয়াই এখন লক্ষ্য।’
বিশ্লেষকদের মতে, ক্রেমলিনের শীর্ষ মহলের এমন কঠোর অবস্থান, ক্রমবর্ধমান পারমাণবিক হুমকি এবং ইউক্রেন রাষ্ট্রকে কার্যত নিঃশেষ করে দেওয়ার প্রকাশ্য ঘোষণা স্পষ্ট ইঙ্গিত দিচ্ছে যে, এই বিধ্বংসী সংঘাত নিকট ভবিষ্যতে থামার কোনো সম্ভাবনা নেই; বরং তা পুরো ইউরোপকে আরও গভীর সংকটের দিকে ঠেলে দিচ্ছে।
সূত্র: বিবিসি
ডিবিসি/এমএনকে