সারা বাংলা
টেকনাফে বিএনপি নেতাকে হত্যা: ১০ মাসেও নেই তদন্তের অগ্রগতি, প্রধানমন্ত্রীর হস্তক্ষেপ চায় পরিবার

কক্সবাজারের টেকনাফে সাবরাং ইউনিয়নের সাবেক ইউপি সদস্য, ক্রীড়া সংগঠক ও আরাফাত রহমান কোকো ক্রীড়া সংসদ টেকনাফ উপজেলা শাখার সভাপতি মো. ইউনুছ সিকদার হত্যার দশ মাস পেরিয়ে গেলেও মামলার তদন্তে দৃশ্যমান অগ্রগতি নেই বলে অভিযোগ করেছে নিহতের পরিবার। দাওয়াতের কথা বলে ফোনে ডেকে নিয়ে পরিকল্পিতভাবে তাকে হত্যা করা হয়েছে বলে দাবি স্বজনদের।
নিহতের স্ত্রী কোহিনুর আক্তার, বড় ছেলে ফারদিন, ছোট মেয়ে ফাতেমা ও ছোট ছেলে আব্দুল জব্বার এখনো পিতার হত্যার বিচার পাওয়ার অপেক্ষায় রয়েছেন।
হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় দায়ের করা মামলায় আটজনের নাম উল্লেখ করে এবং আরও ৭ থেকে ৮ জনকে অজ্ঞাতনামা আসামি করা হলেও এখনো সবাইকে আইনের আওতায় আনা সম্ভব হয়নি। এতে ক্ষোভ ও হতাশা প্রকাশ করেছেন নিহতের স্ত্রী ও স্বজনরা। তারা হত্যাকাণ্ডের সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ তদন্ত, জড়িতদের দ্রুত গ্রেপ্তার এবং বিচার নিশ্চিত করতে সরকারের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন।
তবে পুলিশ বলছে, মামলার তদন্ত কার্যক্রম শেষ পর্যায়ে রয়েছে। পলাতক আসামিদের গ্রেপ্তারে অভিযান অব্যাহত আছে এবং শিগগিরই চূড়ান্ত অভিযোগপত্র (ফাইনাল চার্জশিট) দেওয়া হবে।
দাওয়াতের কথা বলে ডেকে নেওয়ার পর মরদেহ উদ্ধার
পরিবার ও পুলিশ সূত্রে জানা যায়, ২০২৫ সালের ৪ নভেম্বর রাতে আরাফাত রহমান কোকো ক্রীড়া সংসদ টেকনাফ উপজেলা শাখার সাধারণ সম্পাদক মো. আলম প্রকাশ শফিয়া ফোন করে দাওয়াতের কথা বলে ইউনুছ সিকদারকে বাড়ি থেকে ডেকে নিয়ে যান। এরপর থেকে তার আর কোনো খোঁজ পাওয়া যায়নি। পরদিন ৫ নভেম্বর সকালে টেকনাফের হ্নীলা ইউনিয়নের রঙ্গিখালী এলাকায় একটি সেতুর নিচে পানিতে ভাসমান অবস্থায় তার মরদেহ উদ্ধার করা হয়। পরে মরদেহটি ইউনুছ সিকদারের বলে শনাক্ত করা হয় এবং ময়নাতদন্তের জন্য কক্সবাজার সদর হাসপাতালের মর্গে পাঠানো হয়। প্রাথমিকভাবে জানা গেছে ঘটনাটি তদন্তাধীন এবং হত্যাকাণ্ডের কারণ হিসেবে আর্থিক লেনদেন বা পাওনা টাকা নিয়ে বিরোধের বিষয়টিও খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
নিহত ইউনুছ সিকদার টেকনাফ উপজেলার সাবরাং ইউনিয়নের সাবেক ইউপি সদস্য। তিনি সাবরাংয়ের চান্দলী পাড়া এলাকার হাজী মোহাম্মদ কাশেমের ছেলে। এ ছাড়া তিনি আরাফাত রহমান কোকো ক্রীড়া সংসদ, টেকনাফ উপজেলা শাখার সভাপতির দায়িত্বও পালন করছিলেন।
নিহতের স্ত্রী কোহিনুর আক্তার বাদী হয়ে ২০২৫ সালের ৬ নভেম্বর রাতে টেকনাফ মডেল থানায় হত্যা মামলা করেন। মামলায় মো. আলম প্রকাশ শফিয়া, মো. হারুন, সাইফুল করিম, রেজাউল করিম, আলী মোহাম্মদ ফোরকান, ইফতেখার আহমেদ মাসুম, নুরুল আবছার ও আলী জোহারসহ আটজনকে নামীয় আসামি করা হয়েছে। পাশাপাশি আরও ৭ থেকে ৮ জনকে অজ্ঞাতনামা আসামি করা হয়। মামলাটি টেকনাফ থানায় ৩০ নম্বর মামলা এবং জি.আর. ৭৯৯/২৫ হিসেবে নথিভুক্ত হয়েছে বলে পুলিশ সূত্রে জানা গেছে।
নিহতের স্ত্রী ও মামলার বাদী কোহিনুর আক্তার বলেন, এটি কোনো স্বাভাবিক মৃত্যু নয়। দাওয়াতের কথা বলে ফোনে ডেকে নিয়ে পরিকল্পিতভাবে তার স্বামীকে হত্যা করা হয়েছে বলে তারা বিশ্বাস করেন।
তিনি অভিযোগ করেন, মামলার প্রধান আসামি মো. আলম ও দ্বিতীয় আসামি মো. হারুন এ ঘটনার মূল পরিকল্পনাকারী। তাদের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক মাদক কারবার ও অস্ত্রধারী সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডে জড়িত থাকার অভিযোগ রয়েছে বলেও দাবি করেন তিনি।
কোহিনুর আক্তারের দাবি, ওই ব্যক্তিদের সঙ্গে বিপুলসংখ্যক অস্ত্রধারী লোকজন রয়েছে। এ কারণে এলাকার অনেকে ভয়ে মুখ খুলতে সাহস পান না। তার অভিযোগ, হত্যাকাণ্ডের প্রায় ১০ মাস পরও আসামিদের কয়েকজন এলাকায় প্রকাশ্যে চলাফেরা করছেন।
তিনি বলেন, আমার স্বামী যে দলের দায়িত্বে ছিলেন, সেই দল ক্ষমতায় আসার পরও আমরা এখন পর্যন্ত সঠিক বিচার পাইনি। হারুনের বিরুদ্ধে হত্যা, অস্ত্র ও মাদকসহ বিভিন্ন অভিযোগে একাধিক মামলা রয়েছে বলেও দাবি করেন কোহিনুর আক্তার। তবে এসব অভিযোগের স্বতন্ত্র যাচাই এ প্রতিবেদনে সম্ভব হয়নি। নিহতের স্ত্রী স্বামীর হত্যার সুষ্ঠু তদন্ত ও ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতে সরকারের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের হস্তক্ষেপ কামনা করেন।
নিহত ইউনুছ সিকদারের ছোট বোন নাবিলা বলেন, আমার ভাইকে হত্যার ১০ মাস পার হয়ে গেলেও আমরা এখনো সুষ্ঠু বিচার পাইনি। পরিবারের একমাত্র চাওয়া- হত্যাকাণ্ডের প্রকৃত রহস্য উদঘাটন করে জড়িতদের আইনের আওতায় আনা।
তিনি অভিযোগ করেন, মামলার প্রধান আসামি মো. আলম ও দ্বিতীয় আসামি হারুনের ভয়ে এলাকার অনেকে কথা বলতে সাহস পান না। অর্থের প্রভাবের কারণেও পরিবার সঠিক বিচার থেকে বঞ্চিত হচ্ছে বলে তারা মনে করছেন।
নাবিলা বলেন, আমরা চাই, নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত জড়িতদের শনাক্ত করা হোক এবং দ্রুত আইনের আওতায় এনে বিচার নিশ্চিত করা হোক।
টেকনাফ উপজেলা আরাফাত রহমান কোকো ক্রীড়া সংসদের সিনিয়র সহসভাপতি মো. রফিক বলেন, ইউনুছ সিকদার সংগঠনটির সভাপতির দায়িত্ব পালন করেছেন। তাকে ডেকে নিয়ে হত্যা করা হয়েছে এ ঘটনায় দীর্ঘ সময় পার হলেও মামলার সব আসামি এখনো আইনের আওতায় না আসায় পরিবারের মধ্যে হতাশা রয়েছে।
তিনি বলেন, মামলার মূল আসামিসহ অন্যদের দ্রুত গ্রেপ্তার করে আইনের আওতায় আনা প্রয়োজন। একই সঙ্গে হত্যাকাণ্ডের সময় ইউনুছ সিকদারের ব্যবহৃত মোবাইল ফোন ও ব্যক্তিগত গাড়ি উদ্ধারের দাবি জানান তিনি।
মো. রফিকের দাবি, হ্নীলা, রঙ্গিখালী, আলীখালী ও উলুচামরী এলাকায় সক্রিয় বিভিন্ন মাদক ও অস্ত্রধারী চক্রের আধিপত্যের বিরোধের সঙ্গেও এই হত্যাকাণ্ডের যোগসূত্র থাকতে পারে। তবে এ বিষয়টি তদন্তে প্রমাণিত হয়েছে কি না, তা এখনো নিশ্চিত নয়।
হত্যাকাণ্ডের প্রতিবাদ ও জড়িতদের গ্রেপ্তারের দাবিতে ২০২৫ সালের ৮ নভেম্বর বিকেল ৩টায় টেকনাফ প্রেসক্লাবের সামনে মানববন্ধন অনুষ্ঠিত হয়। এতে বিএনপি, যুবদল, ছাত্রদলসহ বিভিন্ন অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনের নেতাকর্মী এবং স্থানীয় সাধারণ মানুষ অংশ নেন। সমসাময়িক সংবাদ প্রতিবেদনেও ওই মানববন্ধনের তথ্য প্রকাশিত হয়েছিল। মানববন্ধনে বক্তারা ইউনুছ সিকদারকে দাওয়াতের কথা বলে ডেকে নিয়ে পরিকল্পিতভাবে হত্যা করা হয়েছে বলে অভিযোগ করেন। তারা মামলার সব আসামিকে দ্রুত গ্রেপ্তার, নিরপেক্ষ তদন্ত এবং দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানান।
মামলার তদন্তসংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, ৯ নভেম্বর রাত সাড়ে ৯টার দিকে হ্নীলা ইউনিয়ন পরিষদ ভবনের সামনে থেকে হত্যাকাণ্ডের সন্দেহভাজন মোহাম্মদ সিদ্দিককে (৪৫) গ্রেপ্তার করা হয়। সমসাময়িক সংবাদ প্রতিবেদনেও তার গ্রেপ্তারের তথ্য পাওয়া যায়। এরপর এজাহারনামীয় আসামি হ্নীলা ইউনিয়নের ইউপি সদস্য রেজাউল করিমকে কক্সবাজারের এসআরবি এলাকা থেকে আটক করা হয়। পরে চিকিৎসাধীন অবস্থায় কক্সবাজার সদর হাসপাতালে তার মৃত্যু হয় বলে জানা গেছে। এ ছাড়া এজাহারনামীয় আসামি ইফতেখার আহমেদ মাসুম বিদেশে পালানোর সময় ঢাকার হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের ইমিগ্রেশন পুলিশের হাতে আটক হন। পরে তাকে বিমানবন্দর থানা পুলিশের কাছে হস্তান্তর করা হয় এবং পরবর্তীতে টেকনাফ থানায় নেওয়া হয়।
মামলার তদন্ত কর্মকর্তা টেকনাফ থানার এসআই মিজানুর রহমান বলেন, নিহতের স্ত্রী কোহিনুর আক্তার বাদী হয়ে ৬ নভেম্বর রাতে টেকনাফ মডেল থানায় হত্যা মামলা করেন। মামলায় মো. আলমকে প্রধান আসামি করে আটজনের নাম উল্লেখ করা হয়েছে। এ ছাড়া আরও ৭ থেকে ৮ জনকে অজ্ঞাতনামা আসামি করা হয়েছে। তদন্ত কর্মকর্তা বলেন, মামলাটির তদন্ত কার্যক্রম শেষ পর্যায়ে রয়েছে। শিগগিরই ফাইনাল চার্জশিট দাখিল করা হবে।
তিনি জানান, মামলায় তিনজন আসামিকে আটক করা হয়েছিল। তাদের মধ্যে একজন মারা গেছেন। অন্য আসামিরা বর্তমানে পলাতক রয়েছেন। তারা হাইকোর্ট থেকে জামিন নিলেও নির্ধারিত সময়ে নিম্ন আদালতে হাজির না হওয়ায় ওই জামিন বাতিল হয়ে গেছে বলে জানান তিনি। তদন্ত কর্মকর্তা আরও বলেন, বাদীর সঙ্গে সমন্বয় করে মামলার তদন্ত কার্যক্রম পরিচালনা করা হচ্ছে। পলাতক আসামিদের গ্রেপ্তারে পুলিশের অভিযান অব্যাহত রয়েছে। তবে আসামিরা পলাতক থাকায় এখনো তাদের গ্রেপ্তার করা সম্ভব হয়নি।
একজন সাবেক জনপ্রতিনিধি ও ক্রীড়া সংগঠকের মৃত্যুর ঘটনায় প্রায় দশ মাস পার হলেও মামলার তদন্তের অগ্রগতি নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন নিহতের পরিবার ও স্বজনরা। তাদের দাবি, শুধু কয়েকজনকে গ্রেপ্তার করলেই হবে না; হত্যাকাণ্ডের প্রকৃত রহস্য উদঘাটন করতে হবে। কারা ইউনুছ সিকদারকে ডেকে নিয়েছিল, হত্যাকাণ্ডে কারা সরাসরি জড়িত ছিল এবং এর পেছনে কোনো পরিকল্পনাকারী বা সংঘবদ্ধ চক্র ছিল কি না তদন্তের মাধ্যমে এসব বিষয় স্পষ্ট করার দাবি তাদের।
পরিবারের ভাষায়, আর কতদিন অপেক্ষা করতে হবে? কবে শেষ হবে তদন্ত? হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত সবাই কবে আইনের আওতায় আসবে? এখন নিহতের পরিবার দ্রুত তদন্ত শেষ করে প্রকৃত জড়িতদের শনাক্ত, পলাতক আসামিদের গ্রেপ্তার এবং আদালতের মাধ্যমে মামলার বিচার নিষ্পত্তির অপেক্ষায় রয়েছে।
ডিবিসি/এসডব্লিউএন