বাংলাদেশ, সারা বাংলা
চট্টগ্রামে কারখানার গলিত লোহা ছিটকে চীনা প্রকৌশলীসহ ৩ জনের মৃত্যু

চট্টগ্রামের মিরসরাইয়ে জাতীয় বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চলে ফার্মিক স্টিল লিমিটেডের কারখানায় ফার্নেসের ত্রুটিতে গলিত লোহা ছিটকে দগ্ধ হয়ে চীনা প্রকৌশলীসহ তিনজনের মৃত্যু হয়েছে। দুর্ঘটনার পাঁচ দিন পর সবশেষ শুক্রবার (২ অক্টোবর) মারা যান চীনা প্রকৌশলী জেংলিং হং (৫৩)। এ ঘটনায় আহত অপর শ্রমিক জুয়েল (৩৬) চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের বার্ন ইউনিটে চিকিৎসাধীন রয়েছেন।
এ ঘটনায় নিহত শ্রমিক শরিফুল ইসলামের বাবা মো. সেলিম বাদী হয়ে জোরারগঞ্জ থানায় অপমৃত্যু মামলা করেছেন। শনিবার (৩ অক্টোবর) রাতে নিহতের পরিবারের পক্ষ থেকে করা মামলাটি গ্রহণ করা হয়েছে বলে জানিয়েছে পুলিশ। তবে নিহত মনির হোসেনের মরদেহ এখনো কেউ নিতে আসেনি।
নিহত ব্যক্তিরা হলেন চীনা প্রকৌশলী জেংলিং হং (৫৩), শ্রমিক শরিফুল ইসলাম (২৭) ও মনির হোসেন (২৭)।
গত ২৮ সেপ্টেম্বর দুপুরে ফার্মিক স্টিলের ফার্নেসে ত্রুটি দেখা দিলে গলিত লোহা ছিটকে চারজন দগ্ধ হন। পরে তাদের চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। অবস্থার অবনতি হলে শরিফুল ইসলাম ও জেংলিং হংকে ঢাকার জাতীয় বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটে স্থানান্তর করা হয়।
এর মধ্যে বৃহস্পতিবার (১ অক্টোবর) সকাল সাড়ে ১১টার দিকে ঢাকার জাতীয় বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটে মারা যান শরিফুল ইসলাম। একই দিন রাত সাড়ে ৯টার দিকে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান মনির হোসেন। পরদিন শুক্রবার সকাল ১১টা ৫০ মিনিটে ঢাকার জাতীয় বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটে মারা যান চীনা প্রকৌশলী জেংলিং হং।
কারখানা ও পুলিশ সূত্রে জানা যায়, ফার্নেসে ত্রুটির কারণে গলিত লোহা ছিটকে চারজন দগ্ধ হন। তাদের মধ্যে শরিফুল ইসলাম ও জেংলিং হংয়ের অবস্থা গুরুতর হওয়ায় তাদের ঢাকায় নেয়া হয়েছিল।
নিহত শরিফুল ইসলাম খাগড়াছড়ির মাটিরাঙ্গা উপজেলার আমতলা ইউনিয়নের বাসিন্দা। তার দুটি ছোট সন্তান রয়েছে। শরিফুলের পরিবারকে ১০ লাখ টাকা ক্ষতিপূরণ দেয়ার বিষয়ে কারখানা কর্তৃপক্ষের সঙ্গে আলোচনা হয়েছে। তবে এখনো বিষয়টি চূড়ান্ত হয়নি।
গতকাল শনিবার সন্ধ্যায় এ ঘটনায় জোরারগঞ্জ থানায় শরিফুলের পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে ফার্মিক স্টিলের চীনা ও বাংলাদেশি কর্মকর্তাদের বৈঠক হয়। দোভাষীর মাধ্যমে ক্ষতিপূরণসহ বিভিন্ন বিষয়ে আলোচনা হয়েছে বলে জানিয়েছেন শরিফুলের চাচা মনির হোসেন।
শরিফুলের বাবা মো. সেলিম বলেন, ‘ছেলেকে হারিয়ে আমাদের পরিবার অসহায় হয়ে পড়েছে। মামলা চালানোর সামর্থ্য আমাদের নেই। আমরা মামলা নয়, উপযুক্ত ক্ষতিপূরণ চাই।’
জোরারগঞ্জ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আবদুল হালিম বলেন, ‘দুর্ঘটনায় দগ্ধ চারজনের মধ্যে চীনা প্রকৌশলীসহ তিনজন মারা গেছেন। গতকাল নিহতের পরিবারের পক্ষ থেকে নিহত শরিফুলের বাবা একটি মামলা করেছেন। সেটি অপমৃত্যু মামলা হিসেবে গ্রহণ করা হয়েছে। নিহত মনির হোসেনের মরদেহ নিতে এখন পর্যন্ত তাদের পরিবারের কেউ আসেননি। মরদেহ হস্তান্তরের বিষয়ে প্রয়োজনীয় প্রক্রিয়া অনুসরণ করা হচ্ছে।’
ক্ষতিপূরণের বিষয়ে জানতে চাইলে আবদুল হালিম বলেন, ‘বিষয়টি কোম্পানি ও ভুক্তভোগী পরিবারের মধ্যকার বিষয়। পুলিশ আইন অনুযায়ী প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেবে।’
ইন্ডাস্ট্রিয়াল পুলিশ-৩-এর চট্টগ্রামের পুলিশ সুপার মাহমুদা বেগম বলেন, ‘এটা দুর্ঘটনা, যেহেতু অপমৃত্যু মামলা হয়েছে। তবে দুর্ঘটনার কারণ অনুসন্ধানে তদন্ত কমিটি হবে। তদন্ত কমিটির প্রতিবেদন অনুযায়ী পুলিশ আইনগত ব্যবস্থা নেবে।’
শ্রমিকদের নিয়ে কাজ করা সংগঠন ইয়ং পাওয়ার ইন সোশ্যাল অ্যাকশনের (ইপসা) হেড অব অ্যাডভোকেসি মোহাম্মদ আলী শাহীন বলেন, ‘এটি খুবই মর্মান্তিক হতাহতের ঘটনা। দুর্ঘটনার প্রকৃত কারণ খুঁজে বের করা জরুরি। কারখানা কর্তৃপক্ষ বলছে, ফার্নেসের ত্রুটির কারণে দুর্ঘটনা ঘটেছে। সঠিক তদন্ত ছাড়া দায় কার, তা বলা সম্ভব নয়। প্রত্যক্ষদর্শীদের বক্তব্য নেয়া দরকার। ফার্নেসটি কখন, কোথা থেকে আনা হয়েছে, তার বিস্তারিত তথ্য যাচাই করতে হবে। বিস্ফোরণ অধিদপ্তরসহ সংশ্লিষ্ট সরকারি দপ্তরগুলোর সনদও পরীক্ষা করা প্রয়োজন।’
তিনি আরও বলেন, ‘এ ধরনের দুর্ঘটনা আগে ঘটেছে কি না, ঘটলে কী কারণে ঘটেছিল এবং এরপর কী ব্যবস্থা নেয়া হয়েছিল, এসব বিষয়ও তদন্তে আসা উচিত। দুর্ঘটনার আগে কর্মরত ও আহত শ্রমিকদের প্রয়োজনীয় বিশেষায়িত নিরাপত্তাব্যবস্থা দেয়া হয়েছিল কি না, সেটিও খতিয়ে দেখা দরকার। দুর্ঘটনার সঠিক কারণ উদ্ঘাটন না হলে ভবিষ্যতে এ ধরনের দুর্ঘটনা প্রতিরোধ করা সম্ভব নয়।’
ডিবিসি/ এসভিএন