বিবিধ
রোহিঙ্গা ক্যাম্পে প্রকৌশলীর মৃত্যু, তদন্ত দাবি বুয়েট-৮৮ ব্যাচের প্রকৌশলীদের

গত ২৪ আগস্ট ২০২৬ কক্সবাজারের উখিয়ায় রোহিঙ্গা ক্যাম্প-৩-এ আন্তর্জাতিক অভিবাসন সংস্থার (আইওএম) একটি প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্রের সংস্কারকাজ পরিদর্শনের সময় দুর্ঘটনায় মারা যাওয়া প্রকৌশলী ফারহানা হকের পরিবার দুর্ঘটনার কারণ এবং নিরপেক্ষ ও স্বচ্ছ তদন্তের আয়োজনসহ তার মৃত্যুর কারণ জানিয়ে আইওএম বাংলাদেশ ও এনরুট ইন্টারন্যাশনাল লিমিটেডের কাছে লিখিতভাবে তদন্তের ফলাফল প্রদানের দাবি জানিয়েছে। আজ রবিবার (৪ অক্টোবর) রাজধানীর বনানীতে বুয়েট গ্র্যাজুয়েট ক্লাবে বুয়েট ব্যাচ-৮৮ আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে পরিবারের পক্ষ থেকে এ দাবি জানানো হয়।
সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়, আহছানউল্লা বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে স্নাতক ও মিলিটারি ইনস্টিটিউট অব সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজি থেকে স্নাতকোত্তর (মেজর ইন স্ট্রাকচার) ফারহানা হক গত ৬ আগস্ট তৃতীয় পক্ষ এনরুট ইন্টারন্যাশনাল লিমিটেডের মাধ্যমে সিনিয়র ফিল্ড ইঞ্জিনিয়ার হিসেবে কক্সবাজারে আইওএমের অবকাঠামো ইউনিটে যোগ দেন। যোগদানের আঠারো দিনের মাথায়, ২৪ আগস্ট, দাপ্তরিক দায়িত্ব পালনকালে দুর্ঘটনার পর তিনি মারা যান; কক্সবাজার সদর হাসপাতালে তাকে মৃত ঘোষণা করা হয়। তিনি দুই বছরের এক ছেলেসন্তানের মা ছিলেন।
সে সময় গণমাধ্যমে প্রকাশিত খবরে উখিয়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তার বরাতে বলা হয়েছিল, পরিদর্শনের সময় চলন্ত একটি জেনারেটরের সঙ্গে তার ওড়না ও চুল পেঁচিয়ে দুর্ঘটনাটি ঘটে।
পরিবারের বক্তব্য অনুযায়ী, ৩ ও ১২ সেপ্টেম্বর পরিবার আইওএমের কাছে ঘটনা-প্রতিবেদন, সিসিটিভি ফুটেজ, নিরাপত্তা ব্যবস্থার বিবরণ ও একটি বৈঠক চেয়ে ই-মেইল দেয়। ১৭ সেপ্টেম্বর আইওএম বাংলাদেশ ই-মেইলের মাধ্যমে লিখিত উত্তরে জানায়, ঘটনাস্থলের কাজ স্থগিত করা হয়েছে এবং প্রাপ্য সিসিটিভি ফুটেজসহ রেকর্ড সংরক্ষণ করা হয়েছে, তবে ফুটেজে ঘটনাটি ধরা পড়েনি। ই-মেইলের মাধ্যমে পরিবারকে ব্রিফিং দেয়ার প্রস্তাবকে পরিবার স্বাগত জানিয়েছে, পরিবার ব্রিফিংয়ের প্রস্তাব গ্রহণও করেছে। এনরুট ইন্টারন্যাশনাল জানিয়েছে, তাদের পর্যালোচনা ও তদন্ত চলছে এবং কোনো ঘটনা-প্রতিবেদন চূড়ান্ত হয়নি।
বক্তব্যে বলা হয়, মৃত্যুর পাঁচ সপ্তাহের বেশি সময় পরও আইওএম বা এনরুট কেউই পরিবারকে আনুষ্ঠানিকভাবে জানায়নি, দুর্ঘটনাটি কীভাবে ঘটেছিল বা এর কারণ কী।
ফারহানার বাবা প্রকৌশলী এ কে ফজলুল হক বলেন, ‘একজন বাবা হিসেবে আমার চাওয়া খুব সাধারণ: আমার মেয়ে কীভাবে মারা গেল, সেটা যেন আমরা সঠিকভাবে জানতে পারি; আর কোনো বাবা-মাকে যেন এভাবে সন্তান হারাতে না হয়।’
নির্মাণস্থলের নিরাপত্তা নিয়ে বক্তব্য দেন বুয়েট ব্যাচ-৮৮-এর ড. সৈয়দা সুলতানা রাজিয়া (রাসায়নিক ও পেশাগত নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞ)। তিনি বলেন, ‘পিপিই জরুরি, কিন্তু এটি শেষ রক্ষাকবচ। প্রথম প্রশ্ন হলো, চলমান জেনারেটরটির ঘূর্ণায়মান অংশ কি ঢাকা বা ঘেরা ছিল, আর সংস্কারকাজের এলাকা কি আলাদা করে ঘেরা ছিল?’
বাংলাদেশ শ্রম আইন, ২০০৬-এর ধারা ও বাংলাদেশ শ্রম বিধিমালা, ২০১৫-এর বিধি অনুযায়ী এই প্রাণঘাতী দুর্ঘটনার নোটিশ দেয়া হয়েছে কি না এবং আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা (আইএলও)-এর পেশাগত নিরাপত্তা ও স্বাস্থ্য কনভেনশন, ১৯৮১ (কনভেনশন নম্বর ১৫৫)-এর অনুচ্ছেদ ১৬ অনুযায়ী নিয়োগকর্তাগণকে এটি নিশ্চিত করতে হবে যে, যৌক্তিকভাবে যতদূর সম্ভব, তাদের নিয়ন্ত্রণাধীন কর্মক্ষেত্র, যন্ত্রপাতি, সরঞ্জাম এবং কার্যপ্রক্রিয়া সম্পূর্ণ নিরাপদ এবং স্বাস্থ্যঝুঁকিমুক্ত- তা মেনে চলা হয়েছে কি না, তা-ও জানতে চান তিনি।
বুয়েট ব্যাচ-৮৮-এর ফাহীমা সাহাদাত, যার বাংলাদেশের নির্মাণ শিল্পে, বিশেষত অবকাঠামোগত প্রকল্পসমূহে দীর্ঘ ৩০ বছর কাজের অভিজ্ঞতা রয়েছে, বলেন, ‘একটি প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্রে অসুস্থ মানুষ, বয়স্ক, অন্তঃসত্ত্বা নারী ও শিশুরা আসেন; সংস্কারকাজ চলাকালে কেন্দ্রে রোগী দেখা হচ্ছিল কি না, আর হলে তাদের ও কাজের এলাকা এবং চলমান যন্ত্রপাতির মধ্যে নিরাপত্তা বেষ্টনী ছিল কি না, তা জানা জরুরি।’ সংশ্লিষ্ট দাতা সংস্থাসমূহের প্রতি আইওএমের কাছে তদন্তের ফলাফল জানতে চাওয়ার এবং শরণার্থী ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনারের (আরআরআরসি) কার্যালয়ের প্রতি ফলাফল পরিবারকে জানাতে সহায়তার আহ্বান জানান তিনি।
সমাপনী বক্তব্যে প্রেস কনফারেন্সের সভাপতি মো. হাসিবুর রশীদ বলেন, ‘আমরা চাই, মানবিক কাজের প্রতিটি নির্মাণস্থল নিরাপদ হোক, যেন আর কোনো পরিবারকে এরকম পথ পাড়ি দিতে না হয়।’ সংবাদ সম্মেলনে আরও উপস্থিত ছিলেন বুয়েট-৮৮ ব্যাচের সদস্যগণ ও আহছানউল্লা বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের সাবেক শিক্ষার্থীগণ।
ডিবিসি/ এসভিএন