আন্তর্জাতিক, এশিয়া
যুদ্ধবিধ্বস্ত মিয়ানমারে প্রায় ১৫০০ অভিবাসীকে ফেরত পাঠাল মালয়েশিয়া

মানবাধিকার সংস্থাগুলোর তীব্র নিরাপত্তা উদ্বেগের মাঝেই মালয়েশিয়া থেকে প্রায় দেড় হাজার অভিবাসীকে যুদ্ধবিধ্বস্ত মিয়ানমারে ফেরত পাঠানো হয়েছে। রবিবার (৪ অক্টোবর) মিয়ানমার নৌবাহিনীর জাহাজে করে তারা ইয়াঙ্গুনের কাছের থানলিয়িন নৌ ঘাঁটিতে পৌঁছান। এএফপির সাংবাদিকরা জানান, জাহাজ থেকে নামার পর এসব অভিবাসীকে বাসে করে একটি বৌদ্ধ মঠে ইমিগ্রেশন ও স্বাস্থ্য পরীক্ষার জন্য নেওয়া হয়।
মালয়েশিয়ায় একটি কফি শপে কাজ করার সময় গ্রেপ্তার হওয়া ৫৩ বছর বয়সী কিয়াও সোয়ার থেইন জানান, ২০ মাসের বন্দিজীবনে তিনি স্ক্যাবিস বা খোসপাঁচড়ায় ভুগেছেন, যা তার দেশে ফিরতে চাওয়ার অন্যতম কারণ। মেঝেতে পা গুটিয়ে বসা এই ব্যক্তি বলেন, ‘আমি এখনও আমার পরিবারের সাথে দেখা করতে পারিনি।’ নিজের ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চিত থেইনের কণ্ঠে ছিল হতাশা, ‘আমি কোনো কিছুরই আশা করি না।’
ঘাঁটির বাইরে ভোরেই শত শত পরিবার জড়ো হয়েছিল স্বজনদের বাড়ি নিয়ে যাওয়ার অপেক্ষায়। তবে এক নৌ কর্মকর্তা মেগাফোনে জানিয়ে দেন যে, এখনই তাদের নিয়ে যাওয়া যাবে না, প্রথমে তাদের ইয়াঙ্গুনের বিভিন্ন স্থানে নেওয়া হবে। অপেক্ষারত ৫৫ বছর বয়সী কিয়াও মিন্ট তার তিন নাতিকে নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেন, তিনি ভয় পাচ্ছেন যে তার নাতিদের এখন মিয়ানমারে জোরপূর্বক সামরিক বাহিনী বা জাতিগত সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোতে যোগ দিতে বাধ্য করা হতে পারে। নিরাপত্তা শঙ্কায় নাম প্রকাশ না করা এক নারী তার ১৯ বছর বয়সী ভাইকে খুঁজছিলেন। তিনি বলেন, ‘আমরা ফেরত আসাদের তালিকায় তার নাম দেখেছি, কিন্তু তাকে খুঁজতে আমরা ভেতরে যেতে পারিনি।’
মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী আনোয়ার ইব্রাহিমের ঘোষণা অনুযায়ী, ৫ হাজার মিয়ানমার নাগরিককে ফেরত পাঠানোর যে চুক্তি হয়েছে, এটি তার প্রথম ধাপ। গত মঙ্গলবার মালয়েশিয়া থেকে ১ হাজার ৪৭৬ জন অভিবাসীকে নিয়ে তিনটি জাহাজ রওনা দেয়। মালয়েশীয় গণমাধ্যমের তথ্যমতে, এই দলে বেশিরভাগই পুরুষ, তবে ২৭ শিশু ও ৭৯ জন নারীও রয়েছেন। মালয়েশিয়ার দাবি, বন্দিশিবির থেকে সবাই স্বেচ্ছায় দেশে ফিরতে রাজি হয়েছেন। খুব শিগগিরই আরও সাড়ে তিন হাজার অভিবাসীকে ফেরত পাঠানোর পরিকল্পনা নিয়ে এগোচ্ছে দেশটি। এ নিয়ে আলোচনার জন্য মিয়ানমারের জান্তা প্রধান মিন অং হ্লাইংয়ের খুব শিগগিরই মালয়েশিয়া সফরের কথা রয়েছে।
তবে জাতিসংঘ এবং মানবাধিকার সংস্থাগুলো এই প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা ও অভিবাসীদের নিরাপত্তা নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। বিশেষ করে মালয়েশিয়ায় শরণার্থী বিরোধী মনোভাবের মধ্যে এই দলে নিপীড়িত রোহিঙ্গা সম্প্রদায়ের মানুষ থাকার আশঙ্কা করা হচ্ছে। ফর্টিফাই রাইটস-এর জ্যেষ্ঠ মানবাধিকার বিশেষজ্ঞ ইয়াপ লে শেং বলেন, ‘শাসনব্যবস্থা ফেরত আসা মানুষদের সাথে কেমন আচরণ করবে তা বলার কোনো উপায় নেই।’ ২০২১ সালের সামরিক অভ্যুত্থানের পর থেকে মিয়ানমারে চলমান গৃহযুদ্ধে এখন পর্যন্ত এক লাখের বেশি মানুষ নিহত হয়েছেন। এমন পরিস্থিতিতে জাতিসংঘের মানবাধিকার বিষয়ক প্রধান ভলকার তুর্ক সতর্ক করে বলেছেন, ‘মারাত্মক মানবাধিকার লঙ্ঘন ও নির্যাতনে জর্জরিত একটি দেশে কাউকে জোরপূর্বক ফেরত পাঠানোর সময় এখন নয়।’
ডিবিসি/ এসভিএন