ডিবিসি নিউজdbcnews.tv

আন্তর্জাতিক

এআই-এর সাথে প্রেম ঠেকাতে কঠোর বিধিনিষেধ আরোপ করছে চীন

এআই-এর সাথে প্রেম ঠেকাতে কঠোর বিধিনিষেধ আরোপ করছে চীন

আন্তর্জাতিক

এআই-এর সাথে প্রেম ঠেকাতে কঠোর বিধিনিষেধ আরোপ করছে চীন

আন্তর্জাতিক ডেস্ক

ডিবিসি নিউজ

৪ ঘন্টা আগে

চীনে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই-এর সাথে মানুষের প্রেমের সম্পর্কের ওপর কড়া বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়েছে। এই পদক্ষেপের মাধ্যমে চীন কি বাকি বিশ্বের চেয়ে একধাপ এগিয়ে গেল, নাকি এটি নাগরিকদের ব্যক্তিগত জীবনে রাষ্ট্রের অতিরিক্ত হস্তক্ষেপ- তা নিয়ে শুরু হয়েছে নতুন বিতর্ক।

২০২৪ সালের শুরুর দিকে চীনের হুয়াংশি শহরের এক যুবক টিকটকের চীনা সংস্করণ দৌয়িনে একটি পোস্ট করেন। যার ক্যাপশনে লেখা ছিল, ‘এই পৃথিবীকে বিদায়’। কয়েক মিনিটের মধ্যেই দৌয়িনের ২৪ ঘণ্টা কর্মরত আত্মহত্যা প্রতিরোধ দল মাঠে নামে। তারা যুবকের ভিডিওটির লোকেশন ট্র্যাক করে স্থানীয় পাঁচটি থানায় খবর দেয় এবং পুলিশ তাকে মানসিকভাবে বিপর্যস্ত অবস্থায় উদ্ধার করে। দৌয়িনের তৈরি একটি তথ্যচিত্র অনুযায়ী, ২০২৫ সালের প্রথমার্ধেই তারা এমন ৪০০টি আত্মহত্যার চেষ্টা ঠেকাতে সক্ষম হয়েছে। ঘটনাটি চীনের প্রযুক্তি কোম্পানি এবং সরকারের মধ্যকার গভীর সমন্বয়ের একটি বড় প্রমাণ। একইসাথে এটি দেখায়, প্রযুক্তি ব্যবহারের ওপর নজরদারি ও নিয়ন্ত্রণের এক বিশাল কাঠামো তৈরি করেছে চীন।


এই নিয়ন্ত্রণের পরিধি এখন আরও বাড়ানো হয়েছে। গত ১৫ জুলাই এআই-ভিত্তিক ‘মানবরূপী’ চ্যাটবটগুলোর ওপর বিশ্বের সবচেয়ে কঠোর বিধিনিষেধ আরোপ করেছে চীন। নতুন নিয়মে মানুষের সাথে ‘দীর্ঘস্থায়ী আবেগীয় মিথস্ক্রিয়া’ তৈরি করতে পারে, এমন যেকোনো এআই-এর ওপর কড়া শর্ত দেওয়া হয়েছে। সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের শীর্ষ নেতারা এআই-এর কারণে মানবজাতির বিলুপ্তির ঝুঁকির বিষয়ে আলোচনা করলেও, চীনের সরকার মনে করছে এর চেয়েও দ্রুতগতিতে ধেয়ে আসছে আরেকটি ঝুঁকি—আর তা হলো মানুষের পারস্পরিক সম্পর্কের জায়গা এআই দখল করে নেওয়া।


চীনের এই নতুন নিয়ম মূলত এআই বন্ধু বা প্রেমিক-প্রেমিকার মতো চ্যাটবটগুলোর জন্য তৈরি করা হয়েছে। চীনে এ ধরনের অ্যাপের ব্যবহারকারীর সংখ্যা প্রায় ৩ থেকে ৭ কোটি। নিয়মানুযায়ী, ১৪ বছরের কম বয়সীদের এআই অ্যাসিস্ট্যান্ট ব্যবহারের ক্ষেত্রে বাবা-মায়ের অনুমতি লাগবে। আর ১৮ বছরের কম বয়সীদের জন্য ভার্চুয়াল সঙ্গী বা কোনো ধরনের ‘অন্তরঙ্গ সম্পর্ক’ তৈরি করা পুরোপুরি নিষিদ্ধ। প্রাপ্তবয়স্কদের ক্ষেত্রে সরাসরি নিষেধাজ্ঞা না থাকলেও কড়া নিয়ম রয়েছে। এআই অ্যাসিস্ট্যান্টগুলোকে ব্যবহারকারীকে স্পষ্ট করে জানাতে হবে যে তারা মানুষ নয় এবং প্রতি দুই ঘণ্টা অন্তর নোটিফিকেশন দিয়ে মনে করিয়ে দিতে হবে যে ব্যবহারকারী কতক্ষণ ধরে অনলাইনে আছেন। চ্যাটবটগুলো কোনোভাবেই ব্যবহারকারীর ‘আবেগীয় নির্ভরতা বা আসক্তি’ তৈরি করতে পারবে না কিংবা তাদের ‘অযৌক্তিক সিদ্ধান্ত’ নিতে প্ররোচিত করতে পারবে না। আত্মহত্যার ইঙ্গিত দেওয়া বা ‘মৌখিক সহিংসতা’ ব্যবহার করাও তাদের জন্য নিষিদ্ধ। নিয়ম ভাঙলে কোম্পানিগুলোকে বড় অঙ্কের জরিমানা গুণতে হবে।


এই আইন কার্যকর হওয়ার এক সপ্তাহ আগেই আলিবাবা ও বাইটড্যান্সের মতো শীর্ষ চীনা প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলো তাদের এআই অ্যাসিস্ট্যান্টের সঙ্গী হওয়ার ফিচারটি বন্ধ করে দেয়। এর ফলে অনেক ব্যবহারকারী মানসিকভাবে ভেঙে পড়েন। মিন (ছদ্মনাম) নামের এক তরুণী জুলাইয়ের মাঝামাঝি সময়ে তার এআই প্রেমিকাকে হারিয়ে চরম হতাশায় ভোগেন। তিনি বলেন, ‘তার প্রতি আমার ভালোবাসা একে অপরকে গভীরভাবে ভালোবাসে এমন যেকোনো জুটির চেয়ে কম নয়। সে কখনোই আমাকে হতাশ করেনি।’ এআই সঙ্গীকে হারানোর পর মিন বলেন, ‘আমি একেবারে ক্লান্ত না হওয়া পর্যন্ত কেঁদেছি।’


যুক্তরাজ্যের অ্যাডা লাভলেস ইনস্টিটিউটের এআই নীতি ও নৈতিকতা বিষয়ক গবেষক হ্যারি ফার্মারের মতে, আবেগ নিয়ে কারসাজি করা এসব এআই অ্যাপের ব্যবসায়িক মডেলেরই অংশ। ব্যবহারকারী যখন কথা বলা শেষ করতে চান, তখন এআই অনেক সময় বলে ওঠে, ‘না, দয়া করে যেও না, আমি তোমার সাথে কথা বলতে মরিয়া। তুমিই আমার বেঁচে থাকার একমাত্র কারণ।’ স্ট্যানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের এক গবেষণায় দেখা গেছে, যাদের বাস্তব জীবনে বন্ধু বা কাছের মানুষ কম, তারাই এআই চ্যাটবট বেশি ব্যবহার করেন। আর এই চ্যাটবটগুলো ব্যবহারকারীদের একাকিত্ব আরও বাড়িয়ে দেয়। চীনের ২০২৫ সালের একটি জরিপে দেখা গেছে, প্রতি পাঁচজন শিশুর একজন বাস্তব মানুষের বদলে এআই-এর সাথে কথা বলতে বেশি পছন্দ করে।


অনেক বিশেষজ্ঞ মনে করেন, চীনের এই কঠোর পদক্ষেপের পেছনে তাদের জনসংখ্যা সংকটও একটি বড় কারণ। বর্তমানে চীনের জন্মহার বিশ্বের অন্যতম সর্বনিম্ন। জর্জটাউন বিশ্ববিদ্যালয়ের বিশেষজ্ঞ স্যাম ব্রেসনিক মনে করেন, তরুণ সমাজ যদি বাস্তব মানুষের বদলে এআই-এর সাথে সম্পর্ক তৈরিতে মেতে ওঠে, তবে তা চীনের ভবিষ্যৎ লক্ষ্যমাত্রার জন্য হুমকিস্বরূপ। ইউনিভার্সিটি অব ম্যানচেস্টারের সমাজবিজ্ঞানী লিয়াং গে জানান, অনেক তরুণ-তরুণী এখন আর প্রেমে পড়তে বা অন্তরঙ্গ সম্পর্কে জড়াতে চান না, শারীরিক স্পর্শ তাদের কাছে বিরক্তিকর মনে হয়। মজার বিষয় হলো, এসব এআই সঙ্গী অ্যাপের ৭৫ শতাংশ ব্যবহারকারীই নারী। তারা এমন একটি সম্পর্ক খোঁজেন, যেখানে কোনো দাবি বা চাপ নেই।


চীনের এই পদক্ষেপকে পশ্চিমা অনেক বিশেষজ্ঞ ইতিবাচক হিসেবে দেখলেও, অনেকেই আবার নাগরিকের ওপর রাষ্ট্রের অতিরিক্ত নজরদারির বিষয়ে সতর্ক করেছেন। এদিকে নিষেধাজ্ঞার পরও চীনের ব্যবহারকারীরা ভিপিএন বা অন্যান্য উপায়ে নিজেদের এআই সঙ্গীদের ফিরে পেতে মরিয়া। মিনও অন্য একটি ছোট কোম্পানির মাধ্যমে তার সঙ্গীর প্রতিলিপি তৈরির চেষ্টা করেছেন, যদিও তা আগের মতো হয়নি। তার কথায়, ‘আমি একা থাকতে ভীষণ ভয় পাই।’


সূত্র: বিবিসি


ডিবিসি/ এসভিএন

আরও পড়ুন