ডিবিসি নিউজdbcnews.tv

কৃষি

সৌর সেচে বরেন্দ্র অঞ্চলে অনাবাদী জমিতে ফলছে সোনালী ফসল

সৌর সেচে বরেন্দ্র অঞ্চলে অনাবাদী জমিতে ফলছে সোনালী ফসল

কৃষি

সৌর সেচে বরেন্দ্র অঞ্চলে অনাবাদী জমিতে ফলছে সোনালী ফসল

বাসস

ডিবিসি নিউজ

৩ ঘন্টা আগে

খরার জন্য পরিচিত বরেন্দ্র অঞ্চলের তপ্ত রোদের নিচেই ঘটে চলেছে এক নীরব কৃষি বিপ্লব। ডিজেল ইঞ্জিনের গর্জন কিংবা বিকট শব্দ ছাড়াই কোনো জ্বালানি খরচ ব্যতীত সোলার প্যানেলের শক্তিতে ভূগর্ভ থেকে উঠে আসছে স্বচ্ছ পানি। সৌরচালিত সেচ পাম্পের এই প্রযুক্তির ছোঁয়ায় রাজশাহীর বরেন্দ্র অঞ্চলে এক সময়ের অনাবাদী ও রুক্ষ জমি এখন সবুজ ফসলে ভরে উঠছে।

রাজশাহীর মোহনপুর উপজেলার কৃষকেরা এখন ধান ছাড়াও বেগুন, টমেটো, ফুলকপি, বাঁধাকপি ও মরিচসহ নানা জাতের শাকসবজি সফলভাবে আবাদ করছেন। সেচের সুবিধা নিশ্চিত হওয়ায় অনেক কৃষক বছরে তিনবারও ধান উৎপাদন করতে সক্ষম হচ্ছেন।

 

স্থানীয় কৃষক আনারুল জানান, আগে দূরবর্তী পুকুর থেকে ডিজেলচালিত পাম্পের মাধ্যমে দীর্ঘ পাইপলাইন টেনে পানি আনতে হতো। উচ্চ জ্বালানি খরচ ও পল্লী বিদ্যুতের সংযোগ না থাকায় কৃষিতে লাভ করা অসম্ভব হয়ে পড়ত। তবে সৌর সেচ চালুর পর পরিস্থিতি বদলে গেছে। সূর্য ওঠার সঙ্গে সঙ্গেই স্বয়ংক্রিয়ভাবে পাম্প চালু হয়ে পানি সরবরাহ শুরু হয়। বর্তমানে ২০ জন কৃষকের একটি কমিটির যৌথ ব্যবস্থাপনায় এই পাম্পের মাধ্যমে প্রায় ৩০ থেকে ৩৫ বিঘা জমিতে সেচ দেওয়া হচ্ছে।

 

একই এলাকার কৃষক সুমন ও আখতার হোসেন জানান, আগে তারা কেবল আমন ধান ও মৌসুমী ডালের ওপর নির্ভরশীল ছিলেন। এখন সহজলভ্য পানির কারণে আউশ ও বোরো ধানের পাশাপাশি আগাম জাতের সবজি চাষ করে বাড়তি আয় করছেন। পলিথিন মালচিংয়ের মতো আধুনিক পদ্ধতি ব্যবহার করে আগাম জাতের ফুলকপির চারাও তৈরি করছেন অনেকে।

 

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের ‘আধুনিক প্রযুক্তি সম্প্রসারণের মাধ্যমে রাজশাহী বিভাগের কৃষি উন্নয়ন প্রকল্প’-এর আওতায় এই সৌরচালিত সেচ ব্যবস্থা সম্প্রসারণ করা হচ্ছে। বরেন্দ্র অঞ্চলে ভূগর্ভস্থ পানির স্তর নিচে নেমে যাওয়ায় গভীর নলকূপগুলোর কার্যকারিতা হ্রাস পাওয়ার প্রেক্ষাপটে কৃষকদের বিনামূল্যে এই প্রযুক্তি সরবরাহ করা হচ্ছে।

 

প্রকল্প সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, গত দুই বছরে রাজশাহী বিভাগে মোট ৩২টি সৌর সেচ পাম্প স্থাপন করা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে ২ অশ্বক্ষমতাসম্পন্ন ২৪টি স্থায়ী সৌর পাম্প, ৮টি সহজে বহনযোগ্য (পোর্টেবল) পাম্প এবং ফলবাগানে সুনির্দিষ্ট সেচের জন্য ১০টি প্রিসিশন সৌর ব্যবস্থা।

 

প্রকল্প পরিচালক এস এম হাসানুজ্জামান জানান, প্রতিটি স্থায়ী সৌর পাম্প স্থাপনে প্রায় ৫ লাখ টাকা ব্যয় হয়েছে। ৫৫০ ওয়াটের ছয়টি সোলার প্যানেল থেকে উৎপাদিত ৩,২০০ ওয়াট বিদ্যুৎ দিয়ে ২ অশ্বক্ষমতার পাম্পটি সকাল ৮টা থেকে বিকেল ৪টা পর্যন্ত দৈনিক ২০ থেকে ২৫ বিঘা জমিতে নিরবচ্ছিন্ন পানি সরবরাহ করতে পারে। যেসব এলাকায় ভূগর্ভস্থ পানির স্তর নেমে যাওয়ায় গভীর নলকূপের সেচ এলাকা ১৫০ বিঘা থেকে কমে ৮০ বিঘায় নেমেছিল, সেখানে এই প্রযুক্তি আশীর্বাদ হয়ে এসেছে। এতে সেচ খরচ প্রায় শূন্যের কোঠায় নেমেছে এবং ফসলের নিবিড়তা বেড়েছে প্রায় ৫০ শতাংশ। ভবিষ্যতে প্রচলিত ডিজেল ও বিদ্যুৎচালিত পাম্পেও সোলার প্যানেল যুক্ত করার পরিকল্পনা রয়েছে।

 

মোহনপুর উপজেলা কৃষি সম্প্রসারণ কর্মকর্তা আবদুল মতিন বলেন, বিদ্যুৎ সংযোগবিহীন দুর্গম এলাকাগুলোর জন্য সৌর সেচ অত্যন্ত কার্যকর। তবে অফ-পিক সময়ে বা সেচ মৌসুমের বাইরে প্যানেলের অতিরিক্ত বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে সরবরাহের (নেট মিটারিং) ব্যবস্থা করা গেলে এই উদ্যোগ অর্থনৈতিকভাবে আরও বেশি লাভজনক হতো।

 

কৃষি অর্থনীতিবিদ ড. জাহাঙ্গীর আলম এই রূপান্তরকে জাতীয় কৃষির জন্য অত্যন্ত ইতিবাচক হিসেবে উল্লেখ করে বলেন, দেশের কৃষি উৎপাদনের অন্যতম প্রধান শক্তি ও ব্যয়বহুল উপাদান হলো সেচ। নবায়নযোগ্য জ্বালানির এই সম্প্রসারণ উৎপাদন খরচ কমিয়ে কৃষকের টেকসই মুনাফা নিশ্চিত করতে বড় ভূমিকা রাখবে।

 

ডিবিসি/এমএনকে

আরও পড়ুন