ডিবিসি নিউজdbcnews.tv

সারা বাংলা

কক্সবাজারে বানাচ্ছিলেন ‘বিশ্বভ্রমণের’ নৌকা, সাগরে এক ছেলেকে হারিয়ে দেশে ফিরছে নিউজিল্যান্ডের পরিবার

কক্সবাজারে বানাচ্ছিলেন ‘বিশ্বভ্রমণের’ নৌকা, সাগরে এক ছেলেকে হারিয়ে দেশে ফিরছে  নিউজিল্যান্ডের পরিবার

সারা বাংলা

কক্সবাজারে বানাচ্ছিলেন ‘বিশ্বভ্রমণের’ নৌকা, সাগরে এক ছেলেকে হারিয়ে দেশে ফিরছে নিউজিল্যান্ডের পরিবার

কক্সবাজার প্রতিনিধি

ডিবিসি নিউজ

১ ঘন্টা আগে

সমুদ্রপথে বিশ্বভ্রমণের স্বপ্ন নিয়ে নিউজিল্যান্ডের জন এডওয়ার্ডের পরিবারের চার সদস্য ২০২৪ সালে ট্যুরিস্ট ভিসা নিয়ে বাংলাদেশে আসেন। নিজস্ব পরিকল্পনার অংশ হিসেবে তারা কক্সবাজার উপকূলের বাঁকখালী নদীর তীরে তৈরি করেছিলেন বিলাসবহুল ও শৌখিন নৌযান ‘আইল্যান্ড গার্ল’। সেই নৌযানে সমুদ্রপথে বিশ্বভ্রমণ শেষে নিজ দেশে ফেরার কথা ছিল তাদের।

কিন্তু সেই স্বপ্ন পূরণ হয়নি। গত ২৫ আগস্ট কক্সবাজার শহরের বাঁকখালী নদীর মোহনা সংলগ্ন নাজিরারটেক এলাকার কাছাকাছি সাগরে ‘আইল্যান্ড গার্ল’ নামের জোড়া বোটটি ডুবে যায়। ওই সময় নিউজিল্যান্ডের ওই পরিবারের তিনজনকে জীবিত উদ্ধার করা গেলেও কিশোর আলবার্ট নিখোঁজ থাকে। পরে তার মরদেহ উদ্ধার হয়।

 

স্বপ্নভঙ্গের দেড় মাস পর নানা আইনি প্রক্রিয়া এবং পাসপোর্ট-ভিসার মেয়াদ সংক্রান্ত জটিলতা কাটিয়ে সেই পরিবারের তিন সদস্য শুক্রবার মধ্যরাতেই আকাশপথে নিজ দেশে ফিরছেন। তারা হলেন- জন এডওয়ার্ড, তার স্ত্রী বেলা (৩৬) ও ছেলে রালফ (১৩)।

 

তবে বাঁকখালী নদীর তীরে পড়ে আছে সমুদ্রপথে বিশ্বভ্রমণের জন্য কোটি টাকা ব্যয়ে তৈরির পর বিধ্বস্ত হওয়া স্বপ্নের নৌযান ‘আইল্যান্ড গার্ল’। আর নদীর খুব কাছের একটি শ্মশানে তারা রেখে যাচ্ছেন কিশোর সন্তান আলবার্টের (১৬) দেহাবশেষ।

 

গত ২৫ আগস্ট বোটডুবির ঘটনার পর জীবিত তিনজনই ছিলেন কক্সবাজার জেলা প্রশাসনের তত্ত্বাবধানে। দেড় মাস ধরে বাংলাদেশ পর্যটন করপোরেশনের মোটেল শৈবালে অবস্থান করছিলেন তারা। তাদের নিরাপত্তার জন্য সেখানে পুলিশও মোতায়েন করা ছিল।

 

কক্সবাজার জেলা প্রশাসনের পর্যটন সেলের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট মাহমুদুর রহমান জানান, পরিবারের তিন সদস্যের দেশে ফেরার প্রয়োজনীয় প্রক্রিয়া শেষ হয়েছে। সবকিছু ঠিক থাকলে শুক্রবার মধ্যরাতে তারা নিউজিল্যান্ডের উদ্দেশে রওনা হবেন।

 

তিনি জানান, নৌকাডুবির সময় পরিবারের সদস্যদের পাসপোর্টসহ প্রয়োজনীয় কিছু গুরুত্বপূর্ণ নথি হারিয়ে যায়। ফলে দেশে ফেরার ব্যবস্থা করা সহজ ছিল না। বাংলাদেশে নিউজিল্যান্ডের কোনো দূতাবাস না থাকায় শ্রীলঙ্কায় অবস্থিত নিউজিল্যান্ড দূতাবাসের সঙ্গে অনলাইন ও ভার্চ্যুয়াল যোগাযোগের মাধ্যমে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হয়।

 

নিউজিল্যান্ডের পরিবারটি সম্পর্কে যা জানা গেছে:
সংশ্লিষ্ট সূত্রে প্রাপ্ত তথ্যমতে, নিউজিল্যান্ডের নাগরিক জন এডওয়ার্ড তার পরিবারের চার সদস্যসহ বিশ্বভ্রমণের উদ্দেশ্যে ২০২৪ সালে ট্যুরিস্ট ভিসায় বাংলাদেশে আসেন। নিজস্ব পরিকল্পনার অংশ হিসেবে তারা একটি কাঠের বোট বা ট্রলারের মাধ্যমে সমুদ্রপথে বিশ্বভ্রমণের উদ্যোগ নেন।

 

এই উদ্যোগের অংশ হিসেবে পরিবারটির চার সদস্য গত আড়াই বছর ধরে কক্সবাজার উপকূলের কাছাকাছি অবস্থান করছিলেন। কক্সবাজার শহরের এস এম পাড়া উপকূলে তৈরি করা হয়েছিল জোড়া কাঠামোর এই বোটটি, যার নাম দেওয়া হয় ‘আইল্যান্ড গার্ল’। এটি ছিল আধুনিক নকশার একটি নৌযান। এটি নির্মাণে এক কোটি টাকারও বেশি ব্যয় হয়েছিল বলে ধারণা করা হচ্ছে।

 

কুতুবদিয়া পাড়ার স্থানীয় বিএনপি নেতা দিদারুল ইসলাম রুবেল জানান, নৌযানটিতে শীতাতপনিয়ন্ত্রিত কক্ষ, ফ্রিজ, রান্নাঘরসহ বিভিন্ন সুবিধা ছিল। ব্যক্তিগত রোমাঞ্চ ও সমুদ্রভ্রমণের জন্য বিশেষভাবে তৈরি নৌযানটি নির্মাণে প্রায় দুই বছর সময় লেগেছিল বলে জানান তিনি।

 

নিউজিল্যান্ডের ওই পরিবারের চার সদস্য এই নৌযানেই বসবাস করছিলেন। দীর্ঘদিন ধরে নৌযানটি কক্সবাজারের বাঁকখালী নদীতে নুনিয়াছড়া বিআইডব্লিউটিএ জেটির বিপরীত পাশে নোঙর করা ছিল। ২৫ আগস্ট বোটটি ডুবে গেলে তিনজনকে জীবিত উদ্ধার করা হয় এবং একদিন পর একজনের মরদেহ মেলে।

 

এর আগে চলতি বছরের গত ৮ এপ্রিল রাতে কক্সবাজারের মহেশখালীর সোনাদিয়া চরে নিউজিল্যান্ডের এই পর্যটক পরিবারটি ডাকাতের কবলে পড়েছিল।

 

পরদিন বৃহস্পতিবার (৯ এপ্রিল) সন্ধ্যায় কোস্টগার্ডের মিডিয়া কর্মকর্তা লেফটেন্যান্ট কমান্ডার সাব্বির আলম সুজনের পাঠানো এক বার্তায় বিষয়টি নিশ্চিত করা হয়।

 

ওই বার্তায় বলা হয়েছিল, নিউজিল্যান্ডের নাগরিক জন এডওয়ার্ড তার পরিবারের চার সদস্যসহ বিশ্বভ্রমণের উদ্দেশ্যে ২০২৪ সালে ট্যুরিস্ট ভিসায় বাংলাদেশে আসেন। নিজস্ব পরিকল্পনার অংশ হিসেবে তারা কাঠের বোটে সমুদ্রপথে বিশ্বভ্রমণের উদ্যোগ নেন। বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ ও বাংলাদেশ কোস্টগার্ড নিরাপত্তাজনিত ঝুঁকি পর্যালোচনা করে তাদের এ ধরনের সমুদ্রযাত্রা থেকে বিরত থাকার পরামর্শ দেয় এবং চলতি বছরের গত ১ মার্চ প্রয়োজনীয় নিরাপত্তা নির্দেশনা জারি করে। সে সময় তাদের পাসপোর্ট পর্যালোচনায় দেখা যায়, ১৬ জানুয়ারি ২০২৬ তারিখে তাদের পাসপোর্টের মেয়াদ শেষ হয়েছে। তবে কর্তৃপক্ষের নির্দেশনা উপেক্ষা করে তারা মহেশখালীর সোনাদিয়া চরে বোটসহ অবস্থান করছিলেন। এ অবস্থায় বুধবার রাতে একদল দুর্বৃত্ত তাদের ওপর অতর্কিত হামলা চালায়। খবর পেয়ে বাংলাদেশ কোস্টগার্ডের একাধিক দল দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছে অভিযান চালিয়ে পর্যটকদের জীবিত উদ্ধার করে।

 

বাঁকখালী নদীর তীরে পড়ে আছে বিধ্বস্ত স্বপ্নের ‘আইল্যান্ড গার্ল’ আর নিকটের শ্মশানে এক কিশোর সন্তানের দেহাবশেষ:
সমুদ্রে বিশ্বভ্রমণের স্বপ্নভঙ্গ শেষে নিউজিল্যান্ডের পরিবারের তিন সদস্য অবশেষে আকাশপথে স্বদেশে ফিরে যাচ্ছেন। তবে তাদের শেষ স্মৃতি হিসেবে বাঁকখালী নদীতে পড়ে রয়েছে বিধ্বস্ত ‘আইল্যান্ড গার্ল’।

 

নৌযানটির নির্মাণপদ্ধতি সম্পর্কে স্থানীয় জেলে আবদুর রহমান বলেন, দুটি কাঠের নৌযান জোড়া দিয়ে ‘আইল্যান্ড গার্ল’ তৈরি করা হয়েছিল। বড় ঢেউয়ের ধাক্কায় সংযোগস্থল ভেঙে গিয়ে একটি অংশ দ্রুত ডুবে যায়। কয়েক মিনিটের মধ্যে অন্য অংশটিও তলিয়ে যায়। নুনিয়াছড়ার বিআইডব্লিউটিএ জেটির বিপরীতে বাঁকখালী নদীতে এখনো নিমজ্জিত অবস্থায় পড়ে আছে বোটটি।

 

আর তাদের এক সন্তানের দেহাবশেষ রয়েছে নদীর তীরের শ্মশানে।

 

কক্সবাজার সদর মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা শেখ মোহাম্মদ আলী জানান, ওই কিশোরের মরদেহ উদ্ধারের পর আইনি প্রক্রিয়া ও ময়নাতদন্ত সম্পন্ন করা হয়। পরে পুলিশের উপস্থিতিতে বাঁকখালী তীরের শ্মশানে আলবার্টের শেষকৃত্য সম্পন্ন হয়। এ বিষয়ে নিউজিল্যান্ডের দূতাবাস ও পরিবারের যথাযথ অনুমতি নেওয়া হয়েছিল।

 

ডিবিসি/এসডব্লিউএন

আরও পড়ুন