ডিবিসি নিউজdbcnews.tv

শিক্ষা

চিত্রকলার কিংবদন্তি এস এম সুলতানের ৩২তম প্রয়াণবার্ষিকী আজ

চিত্রকলার কিংবদন্তি এস এম সুলতানের ৩২তম প্রয়াণবার্ষিকী আজ

শিক্ষা

চিত্রকলার কিংবদন্তি এস এম সুলতানের ৩২তম প্রয়াণবার্ষিকী আজ

ডেস্ক নিউজ

ডিবিসি নিউজ

১ ঘন্টা আগে

মাটিতে লাঙল চালাচ্ছেন কৃষক। ফসল ঘরে তুলছেন, দৈনন্দিন শ্রমে এগিয়ে নিচ্ছেন জীবন। চেনা গ্রামবাংলার এসব দৃশ্য এস এম সুলতানের ক্যানভাসে এসে পেয়েছে অন্য এক মাত্রা। তাঁর আঁকা মানুষের সুঠাম দেহ, স্ফীত পেশি আর দৃঢ় ভঙ্গিতে প্রকাশ পেয়েছে শ্রমের শক্তি।

কৃষিজীবী মানুষকে তিনি চিত্রকলার কেন্দ্রে এনেছেন এমন এক মহিমায়, যেখানে তাঁদের শ্রম ও সৃষ্টিশীলতাই হয়ে উঠেছে ছবির প্রধান বক্তব্য। বেঙ্গল ফাউন্ডেশনের শিল্পী-পরিচিতিতেও তাঁর পেশিবহুল কৃষক অবয়বকে শক্তি ও কর্মোদ্যমের প্রকাশ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।

 

আজ শনিবার (১০ অক্টোবর) বাংলাদেশের চিত্রকলার এই স্বতন্ত্র শিল্পীর ৩২তম প্রয়াণবার্ষিকী। ১৯৯৪ সালের এই দিনে যশোরের সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালে শেষনিশ্বাস ত্যাগ করেন তিনি। তিন দশকের বেশি সময় পেরিয়েও তাঁর শিল্পের সামনে দাঁড়ালে ফিরে আসে শ্রম, মানুষের মর্যাদা এবং মাটির সঙ্গে জীবনের সম্পর্কের প্রশ্ন।

 

নড়াইলের মাছিমদিয়ায় সুলতানের জন্ম। শৈশবের পরিচিত নাম লাল মিয়া। গ্রামের জীবন ও কৃষিকাজের অভিজ্ঞতা তাঁর শিল্পভাবনার গভীরে জায়গা করে নেয়। পরবর্তী সময়ে দেশ-বিদেশে ঘুরেছেন, পরিচিত হয়েছেন শিল্পচর্চার নানা ধারার সঙ্গে। তবু তাঁর সৃষ্টির প্রধান আশ্রয় হয়ে থেকেছে বাংলার গ্রাম ও সেখানকার মানুষ।

 

শিল্পশিক্ষার আকাঙ্ক্ষা তাঁকে নিয়ে যায় কলকাতায়। শিল্পসমালোচক ও শিল্প-ইতিহাসবিদ শহীদ সোহরাওয়ার্দীর সহায়তায় কলকাতা আর্ট স্কুলে ভর্তি হন। তবে প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা শেষ করার আগেই বেরিয়ে পড়েন। শুরু হয় ভ্রমণ ও বিচিত্র অভিজ্ঞতায় গড়ে ওঠা এক জীবন। পঞ্চাশের দশকের শুরুতে যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্যেও যান এবং নিজের কাজ প্রদর্শন করেন। এই বিস্তৃত যাত্রার পর নড়াইলই হয়ে ওঠে তাঁর জীবনের প্রধান ঠিকানা।

 

সুলতানের শিল্পের সবচেয়ে আলোচিত বৈশিষ্ট্য তাঁর আঁকা মানুষের শরীর। বাংলার কৃষকের পরিচিত অবয়বের তুলনায় এই শরীর অনেক বেশি বলিষ্ঠ, কখনো প্রায় অতিমানবীয়। কেন এমন করে এঁকেছেন তিনি সেই প্রশ্নই দর্শককে ছবির গভীরে নিয়ে যায়। বেঙ্গল ফাউন্ডেশনের সংগ্রহ-পরিচিতিতে এই অবয়বের সঙ্গে বাস্তবের কৃষিজীবনের ব্যবধানকে প্রত্যাশা ও বাস্তবতা, শোষণ ও ন্যায়বিচারের টানাপোড়েনের সূত্রে ব্যাখ্যা করা হয়েছে। সেই পাঠে সুলতানের কৃষক হয়ে ওঠেন নিজের প্রাপ্য মর্যাদা নিয়ে দাঁড়ানো এক মানুষ।

 

এই দৃষ্টিকোণ থেকে তাঁর ছবি দেখলে পেশির দৃঢ়তায় শ্রমের সামাজিক গুরুত্বও ধরা পড়ে। যে মানুষ জমি প্রস্তুত করেন, বীজ বোনেন, ফসল ফলান, তাঁর হাতেই অন্য মানুষের বেঁচে থাকার উপকরণ তৈরি হয়। সুলতানের ক্যানভাস সেই সৃষ্টিশক্তিকে দৃশ্যমান করে। গ্রাম সেখানে নিছক মনোরম পটভূমি হয়ে থাকে না; মানুষের কাজ, সম্পর্ক ও সংগ্রাম মিলিয়ে হয়ে ওঠে ছবির পূর্ণাঙ্গ জগৎ।

 

দেশের শিল্পাঙ্গনে তাঁর কাজের বৃহত্তর পরিচিতি তৈরিতে ১৯৭৬ সালে ঢাকার প্রদর্শনী একটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা। পরে ১৯৮৭ সালে ঢাকার গ্যেটে ইনস্টিটিউট আয়োজিত প্রদর্শনী তাঁর শিল্পীসত্তার মূল্যায়নে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রাখে। চারুকলায় অবদানের স্বীকৃতি হিসেবে তিনি ১৯৮২ সালে একুশে পদক এবং ১৯৯৩ সালে স্বাধীনতা পদক পান।

 

ছবি আঁকার পাশাপাশি শিশুদের শিল্পশিক্ষার জন্যও উদ্যোগ নিয়েছিলেন সুলতান। নড়াইলে শিশুদের জন্য বিদ্যালয় গড়ে তোলেন। শিল্পের সঙ্গে নতুন প্রজন্মের পরিচয় ঘটানোর এই প্রয়াস তাঁর জীবনকে বোঝার আরেকটি দরজা খুলে দেয়। যে গ্রাম ও মানুষের কাছ থেকে তিনি সৃষ্টির উপাদান পেয়েছেন, সেই পরিসরেই শিল্পচর্চার সুযোগ তৈরি করতে চেয়েছেন।

 

তাঁর প্রয়াণবার্ষিকীতে শিল্পকর্ম সংরক্ষণের বিষয়টিও বিশেষ তাৎপর্য বহন করে। সুলতান পাট ও চটের ক্যানভাস এবং প্রাকৃতিক উপাদান থেকে তৈরি রং ব্যবহার করেছেন। তাঁর বেশ কিছু ছবিতে রং বিবর্ণ হওয়া ও উপকরণের ক্ষয় দেখা দেওয়ায় সংরক্ষণের জন্য বিশেষ গবেষণা ও কারিগরি উদ্যোগের প্রয়োজন হয়েছে। বেঙ্গল ফাউন্ডেশনের সংরক্ষণ প্রকল্পে তাঁর শিল্পকর্মের উপাদান পরীক্ষা, ঐতিহাসিক গবেষণা এবং নির্বাচিত কাজের সংরক্ষণ ও পুনরুদ্ধার করা হয়েছে। সংশ্লিষ্ট ডিজিটাল আর্কাইভ গবেষক ও সাধারণ দর্শকের কাছে এসব কাজের তথ্য পৌঁছে দেওয়ার সুযোগও তৈরি করেছে।

 

সুলতানকে স্মরণ করার সঙ্গে তাই তাঁর ছবি যত্নে রাখা, নির্ভরযোগ্য গবেষণা এগিয়ে নেওয়া এবং নতুন প্রজন্মের দেখার সুযোগ বাড়ানোর দায়িত্ব জড়িয়ে আছে। তাঁর ক্যানভাসের সামনে দাঁড়ালে আজও চোখ আটকে যায় সেই শ্রমজীবী মানুষের দিকে যাঁদের হাতে মাটি ফসলে ভরে ওঠে, যাঁদের পরিশ্রমে সচল থাকে জীবন। তাঁদের দৃঢ় উপস্থিতির মধ্যেই বেঁচে আছেন এস এম সুলতান।

 

ডিবিসি/এমএনকে

আরও পড়ুন