ডিবিসি নিউজdbcnews.tv

বাংলাদেশ, রাজধানী

মিরপুর সিটি সেন্টার দখলের অভিযোগ, ১৫০ কোটি টাকা ঋণের বোঝায় ডেভেলপার প্রতিষ্ঠান

মিরপুর সিটি সেন্টার দখলের অভিযোগ, ১৫০ কোটি টাকা ঋণের বোঝায় ডেভেলপার প্রতিষ্ঠান

বাংলাদেশ, রাজধানী

মিরপুর সিটি সেন্টার দখলের অভিযোগ, ১৫০ কোটি টাকা ঋণের বোঝায় ডেভেলপার প্রতিষ্ঠান

ডেস্ক রিপোর্ট

ডিবিসি নিউজ

১৩ ঘন্টা আগে

চব্বিশের গণঅভ্যুত্থানের আগে আওয়ামী লীগের কার্যালয়ের নামে দখলে নেওয়া মিরপুর সিটি সেন্টার এখনো একই ব্যক্তিদের নিয়ন্ত্রণে থাকার অভিযোগ উঠেছে। ব্যাংক থেকে ঋণ নিয়ে নির্মাণ করা ১৭ তলা বাণিজ্যিক ভবনটির নিয়ন্ত্রণ ফিরে পেতে এখনো প্রশাসনের দ্বারে দ্বারে ঘুরছে নির্মাতা প্রতিষ্ঠান এজি প্রপার্টিজ ডেভেলপমেন্টস লিমিটেড। প্রতিষ্ঠানটির দাবি, ভবনটির বিপরীতে দুটি ব্যাংক থেকে নেওয়া প্রায় ১৫০ কোটি টাকার ঋণের বোঝা রয়েছে তাদের ওপর।

রাজধানীর মিরপুর-১ নম্বরে ৩০ কাঠা জমির ওপর নির্মিত মিরপুর সিটি সেন্টার। তিনটি বেজমেন্টসহ ১৭ তলা এই বাণিজ্যিক ভবনের ডেভেলপার প্রতিষ্ঠান এজি প্রপার্টিজ ডেভেলপমেন্টস লিমিটেড।


জানা যায়, ভবনটির জমির মালিক হায়দার আলী খান বহলুলসহ চারজন। অংশীদারত্বের ভিত্তিতে জমির মালিকদের সঙ্গে চুক্তি করে এজি প্রপার্টিজ। রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (রাজউক) অনুমোদন পাওয়ার পর ২০১৩ সালে ভবনটির নির্মাণকাজ শুরু করে প্রতিষ্ঠানটি। তবে কাজ শুরুর পর ডেভেলপার প্রতিষ্ঠান জানতে পারে, জমির মালিকরা অস্ট্রেলিয়ান অ্যাসেট ডেভেলপমেন্ট নামের আরেকটি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গেও চুক্তি করেছেন। অথচ এজি প্রপার্টিজের সঙ্গে চুক্তির সময় বিষয়টি গোপন রাখা হয়েছিল।


অনুসন্ধানে উঠে এসেছে, এভাবে একে একে মোট তিনটি পক্ষের সঙ্গে গোপনে চুক্তি করেছিলেন জমির মালিকরা। শুধু তাই নয়, জমি নিয়ে বিভিন্ন পক্ষের মামলা এবং আদালতের নিষেধাজ্ঞার কারণে নির্ধারিত সময়ে ভবনটির নির্মাণকাজ শেষ করতে পারেনি ডেভেলপার প্রতিষ্ঠান। এতে চরম আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়ে এজি প্রপার্টিজ।


২০২০-২১ সালে করোনা মহামারির মধ্যেও ভবনটির নির্মাণকাজ চালিয়ে যায় প্রতিষ্ঠানটি। তিনটি বেজমেন্টসহ ১৭ তলা ভবনের নির্মাণকাজ এগিয়ে নিতে এবং দ্রুত শেষ করতে দুটি ব্যাংক থেকে প্রায় ১৫০ কোটি টাকা ঋণ নেয় এজি প্রপার্টিজ।


২০২১ সালে ভবনটির নির্মাণকাজ প্রায় ৯৫ শতাংশ শেষ হওয়ার পরই সেটির দখল নিতে মরিয়া হয়ে ওঠেন জমির মালিক হায়দার আলী খান বহলুল, শওকত আলী খান বিপুলসহ অন্যরা। অভিযোগ রয়েছে, ভবনটির নিয়ন্ত্রণ নিতে সেখানে আওয়ামী লীগের একটি কার্যালয় স্থাপন করা হয়।


এজি প্রপার্টিজের অভিযোগ, ওই সময় হায়দার আলী খান, শওকত আলী খান বিপুলসহ পাঁচ ভূমিমালিক আওয়ামী লীগের একটি সশস্ত্র দল নিয়ে ভবনে প্রবেশ করেন। এ সময় ডেভেলপার প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা-কর্মচারী ও প্রকৌশলীদের মারধর করে ভবন থেকে বের করে দেওয়া হয়।


এ বিষয়ে এজি প্রপার্টিজ লিমিটেডের নির্বাহী প্রকৌশলী কামরুল হাসান ভবনটি দখলের ঘটনা ও নির্মাতা প্রতিষ্ঠানের ভোগান্তির বিষয়টি তুলে ধরেন।


অনুসন্ধানে হায়দার আলী খানের রাজনৈতিক প্রভাবের উৎস হিসেবে তার শ্বশুর মনির চৌধুরীর নাম উঠে এসেছে। মনির চৌধুরী কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের মাদারীপুর জেলা শাখার সাবেক সিনিয়র সহসভাপতি এবং মাদারীপুর জেলা পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান।


জানা গেছে, মনির চৌধুরীর আপন চাচাতো ভাই আওয়ামী লীগের সাবেক চিফ হুইপ নূরে আলম লিটন চৌধুরী। অভিযোগ রয়েছে, রাজনৈতিক ক্ষমতার প্রভাব খাটিয়ে তিনি এজি প্রপার্টিজের আমমোক্তারনামা বাতিল করান। এ কাজে মিরপুর সাব-রেজিস্ট্রি অফিসের তৎকালীন সাব-রেজিস্ট্রার নুরুল আমিনও সহযোগিতা করেন বলে তথ্য পাওয়া গেছে।


এজি প্রপার্টিজের ডেপুটি জেনারেল ম্যানেজার হাবিবুল হাসান জানান, আমমোক্তারনামা বাতিলের পাশাপাশি প্রতিষ্ঠানটির কাছে পাঁচ কোটি টাকা চাঁদা দাবি করা হয়। পরিস্থিতির কারণে নিরুপায় হয়ে এক কোটি ২৪ টাকা পরিশোধও করে প্রতিষ্ঠানটি বলে অভিযোগ রয়েছে। আমমোক্তারনামা বাতিলের পরও ডেভেলপার প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে বিদ্যমান চুক্তির কোনো পরোয়া করছেন না জমির মালিকরা।


২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর দেশে ক্ষমতার পালাবদল হলেও ভবনটির নিয়ন্ত্রণ ফিরে পায়নি এজি প্রপার্টিজ। প্রতিষ্ঠানটির অভিযোগ, হায়দার আলী খানসহ পাঁচ ভূমিমালিক এখনো মাফিয়া কায়দায় ভবনটির ওপর প্রভাব বিস্তার করে চলেছেন। ডেভেলপার প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে জমির মালিকদের এমন কর্মকাণ্ডকে নজিরবিহীন বলছেন সংশ্লিষ্ট অনেকে।


সরেজমিনে দেখা যায়, ভবনটিতে ডেভেলপার প্রতিষ্ঠানের অংশে ভাড়া দেওয়া দোকান ও বাণিজ্যিক স্পেসের ভাড়াটিয়াদের কাছ থেকেও জোরপূর্বক ভাড়া আদায়ের চেষ্টা করছেন ভূমিমালিকপক্ষের লোকজন। এ নিয়েও ভোগান্তিতে পড়েছেন সংশ্লিষ্টরা।


এ বিষয়ে রিয়েল এস্টেট অ্যান্ড হাউজিং অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (রিহ্যাব) সিনিয়র ভাইস প্রেসিডেন্ট আব্দুর রাজ্জাক বলেন, যখন আমি চুক্তিতে যাবো, তখন চুক্তিতে যা লেখা আছে তাই হবে। আপনি যত বড় মাপের মানুষ হয়ে থাকুন না কেন, চুক্তির বাহিরে গিয়ে আপনি আমাকে বাহির করতে পারবেন না।  মিরপুর সিটি সেন্টারের বিষয়টি খতিয়ে দেখার কথাও জানান তিনি।


অন্যদিকে সুপ্রিম কোর্টের সিনিয়র আইনজীবী এস এম শাহজাহান এ ধরনের কর্মকাণ্ডকে বেআইনি বলে মন্তব্য করেন। তিনি বলেন,  ভূমি মালিকদের এক ধরনের চিন্তা থাকে। আমার জমি, আমি যে কোন সময় তুলে দিবো! এটা ঠিক নয়। ডেভেলপাররা এখানে ব্যবসা করতে এসেছে। 


তবে যাদের বিরুদ্ধে ভবন দখল, চাঁদাবাজি, রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তার এবং আমমোক্তারনামা বাতিলের অভিযোগ উঠেছে, তাদের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও বক্তব্য পাওয়া যায়নি।


এদিকে ব্যাংক থেকে বিপুল পরিমাণ ঋণ নিয়ে ভবন নির্মাণে বিনিয়োগ করায় চরম আর্থিক সংকটে পড়েছে এজি প্রপার্টিজ। একই সঙ্গে ভবনটিতে যারা দোকান বা বাণিজ্যিক স্পেস কিনেছেন, তারাও পড়েছেন বিপাকে।


ভবনটির নিয়ন্ত্রণ ফিরে পাওয়া, বিনিয়োগ সুরক্ষা এবং চলমান সংকট নিরসনে প্রধানমন্ত্রী ও প্রশাসনের হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন ভুক্তভোগী ক্রেতা এবং ডেভেলপার প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তারা।


ডিবিসি/এসএফএল

আরও পড়ুন