সারা বাংলা
সাতক্ষীরায় বালুমহাল ছাড়াই লাখ লাখ টন বালু উত্তোলনের অভিযোগ

সাতক্ষীরার শ্যামনগরে কোনো ইজারাকৃত বা অনুমোদিত বালুমহাল না থাকা সত্ত্বেও প্রতিদিন নদী থেকে অবৈধভাবে উত্তোলন করা হচ্ছে লাখ লাখ টন বালু। রাত গভীর হলেই নদীগুলোতে শুরু হয় শক্তিশালী ড্রেজার মেশিনের গর্জন।
স্থানীয়দের অভিযোগ, স্থানীয় প্রশাসনের একাংশের সঙ্গে আর্থিক যোগসাজশ রেখে বছরের পর বছর এই বেপরোয়া কারবার চালিয়ে আসছে এক প্রভাবশালী সিন্ডিকেট। এতে উপকূল রক্ষা বাঁধ, গ্রামীণ সড়ক ও নদী অববাহিকার সামগ্রিক পরিবেশ মারাত্মক হুমকির মুখে পড়েছে।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, মানুষের নজর এড়াতে দিনের বেলায় বালু উত্তোলন বন্ধ রাখা হয়। রাত ১০টা থেকে ভোর ৫টা পর্যন্ত শ্যামনগরের বিভিন্ন নদ-নদী থেকে অবাধে চলে বালু তোলার মহোৎসব। ভোর হতেই ডাম্পার ট্রাক ও ট্রলিতে করে সেই বালু পাঠানো হয় দেশের বিভিন্ন প্রান্তে। দিনরাত অতিরিক্ত ওজনের বালুবাহী যান চলাচলের কারণে স্থানীয় সড়কগুলো দেবে গিয়ে ভেঙে পড়ছে। চরম ভাঙন ঝুঁকিতে পড়েছে গাবুরা, পদ্মপুকুর ও বুড়িগোয়ালিনী ইউনিয়নসহ বিস্তীর্ণ উপকূলীয় জনপদ।
অভিযোগ উঠেছে, বিগত সরকারের সময়ে স্থানীয় সাবেক সংসদ সদস্য জগলুল হায়দারের ছত্রচ্ছায়ায় এই শক্তিশালী বালু সিন্ডিকেট গড়ে তোলেন আব্দুর রহমান বাবু (যিনি এলাকায় ‘পেসার বাবু’ নামে পরিচিত)। রাজনৈতিক পটপরিবর্তন হলেও অদৃশ্য শক্তিবলে এখনো ধরাছোঁয়ার বাইরে তিনি। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক সূত্র জানিয়েছে, নদী থেকে প্রতি ফুট বালু বিক্রি হয় গড়ে ৮ টাকায়। এর মধ্যে সিংহভাগ, অর্থাৎ প্রায় ৩ টাকাই সরাসরি চলে যায় এই ‘পেসার বাবু’র পকেটে। বাকি ৫ টাকার অংশ বিশেষ খরচ ও বন্টন দেখিয়ে স্থানীয় প্রশাসন ও ড্রেজার মালিক-শ্রমিকদের ম্যানেজ করা হয়।
অবৈধ এই বালু উত্তোলনের প্রভাব নিয়ে পরিবেশ আন্দোলনের সক্রিয় সদস্য ও সাবেক অধ্যক্ষ আশেক-ই-এলাহী জানান, অপরিকল্পিতভাবে নদী থেকে বালু উত্তোলনের ফলে নদীর তলদেশ চরমভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। এতে পানির স্বাভাবিক প্রবাহ বাধাগ্রস্ত হয়ে বাঁধ ধসে যাওয়ার ঝুঁকি বহুগুণ বেড়ে গেছে। অবিলম্বে বালু উত্তোলন পুরোপুরি বন্ধ করে শ্যামনগরকে রক্ষা করার জোরালো দাবি জানিয়েছেন স্থানীয় বাসিন্দারা।
এ বিষয়ে অভিযুক্ত আব্দুর রহমান বাবুর (পেসার বাবু) সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগের চেষ্টা করে তাকে পাওয়া যায়নি। মুঠোফোনে জানতে চাইলে তিনি অভিযোগ অস্বীকার করে ক্ষোভ প্রকাশ করেন এবং বলেন, ‘আমি এটার সাথে জড়িত না। আমার বিরুদ্ধে অভিযোগ কে করেছে সেটা বলতে হবে। এ বিষয়ে আপনার সাথে কথা বলতে ভালো লাগছে না।’
অন্যদিকে মাসোহারা নেওয়া কিংবা রহস্যজনক নীরবতার অভিযোগ অস্বীকার করেছে স্থানীয় প্রশাসন। সাতক্ষীরার জেলা প্রশাসক মিস কায়সার আজিজ জানান, নদী থেকে অবৈধভাবে বালু উত্তোলনের কোনো সুযোগ নেই। অপরাধীদের বিরুদ্ধে নিয়মিত অভিযান চালানো হচ্ছে এবং ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে আইনি পদক্ষেপ অব্যাহত রয়েছে।
তবে স্থানীয়দের দাবি, মাঝেমধ্যে লোকদেখানো কিছু অভিযান চালানো হলেও স্থায়ী কোনো সুফল মিলছে না। নদী ও উপকূলের অস্তিত্ব রক্ষায় এই সিন্ডিকেটের মূল হোতাদের চিহ্নিত করে কঠোর আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন স্থানীয় বাসিন্দারা।
ডিবিসি/এমএনকে