সারা বাংলা
দ্বারে দ্বারে ঘুরছে নির্মাণ প্রতিষ্ঠান, পুরোনো চক্রেই জিম্মি মিরপুর সিটি সেন্টার

ব্যাংক থেকে ঋণ নিয়ে নির্মাণ করা হয়েছে ১৭ তলাবিশিষ্ট বাণিজ্যিক ভবন। তিনটি বেইজমেন্টসহ ভবনটির নির্মাণকাজ প্রায় শেষ হওয়ার পরই দখল নিয়ে শুরু হয় বিরোধ। নির্মাণকারী প্রতিষ্ঠান এজি প্রপার্টিজ ডেভেলপমেন্টস লিমিটেডের অভিযোগ, জমির মালিকদের একটি পক্ষের সঙ্গে কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের সশস্ত্র ক্যাডারদের যোগসাজশে তাদের কর্মকর্তা-কর্মচারী ও প্রকৌশলীদের মারধর করে ভবন থেকে বের করে দেওয়া হয়।
এরপর আমমোক্তারনামা বাতিল, পাঁচ কোটি টাকা চাঁদা দাবি এবং এক কোটি ২৪ লাখ টাকা আদায়ের অভিযোগও সামনে আসে। অথচ ভবনটির বিপরীতে ব্যাংকের ঋণের পরিমাণ প্রায় ১৫০ কোটি টাকা।
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি পাল্টেছে। দখলদারত্ব ও রাজনৈতিক ক্ষমতার অপব্যবহারের সঙ্গে জড়িত থাকার অভিযোগে অভিযুক্ত অনেকেই কারাগারে, কেউ পলাতক, কেউ ফেরারি। কিন্তু মিরপুর-১ নম্বরে অবস্থিত মিরপুর সিটি সেন্টারের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে বিরোধের অবসান হয়নি।
নির্মাণকারী প্রতিষ্ঠানটির অভিযোগ, ক্ষমতার পালাবদল হলেও ভবনটি এখনো সেই পুরোনো চক্রের নিয়ন্ত্রণে। বছরের পর বছর বিনিয়োগ, ব্যাংকঋণের দায় এবং ব্যবসায়িক ক্ষতির বোঝা নিয়ে প্রতিষ্ঠানটিকে প্রশাসনের এক দপ্তর থেকে অন্য দপ্তরে ঘুরতে হচ্ছে।
প্রশ্ন উঠেছে, রাজনৈতিক ক্ষমতার ছত্রচ্ছায়ায় একটি নির্মাণপ্রতিষ্ঠানকে তার বিনিয়োগ করা ভবন থেকে সরিয়ে দেওয়ার অভিযোগের পরও কেন বিরোধের নিষ্পত্তি হচ্ছে না? কেন ব্যাংকের বিপুল ঋণের দায় বহন করতে হচ্ছে নির্মাণকারী প্রতিষ্ঠানকে, অথচ ভবনটির নিয়ন্ত্রণ ফিরে পাওয়ার বিষয়ে তাদের অনিশ্চয়তা কাটছে না? আর রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পরও যদি একই পক্ষের প্রভাব বহাল থাকে, তাহলে আইন প্রয়োগ ও প্রশাসনিক জবাবদিহি কোথায়?
সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, মিরপুর-১ নম্বরে প্রায় ৩০ কাঠা জমির ওপর নির্মিত হয়েছে মিরপুর সিটি সেন্টার। তিনটি বেইজমেন্টসহ ১৭ তলাবিশিষ্ট এই বাণিজ্যিক ভবনের চারজন ভূমিমালিকের মধ্যে রয়েছেন হায়দার আলী খান বহুলুল। ভূমিমালিকদের সঙ্গে অংশীদারত্বের ভিত্তিতে চুক্তি করে ভবন নির্মাণের দায়িত্ব নেয় এজি প্রপার্টিজ ডেভেলপমেন্টস লিমিটেড। রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের অনুমোদন পাওয়ার পর ২০১৩ সালে নির্মাণকাজ শুরু করে প্রতিষ্ঠানটি।
কিন্তু কাজ শুরু করার পরই নতুন জটিলতার মুখে পড়ে নির্মাণকারী প্রতিষ্ঠান। এজি প্রপার্টিজের অভিযোগ, ভূমিমালিকেরা তাদের সঙ্গে চুক্তির আগেই অস্ট্রেলিয়ান অ্যাসেট ডেভেলপমেন্ট নামের একটি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে চুক্তি করেছিলেন। এজি প্রপার্টিজের সঙ্গে চুক্তির সময় বিষয়টি জানানো হয়নি।
অনুসন্ধানে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, জমির মালিকপক্ষ একে একে মোট তিনটি পক্ষের সঙ্গে গোপনে চুক্তি করে। একই জমি নিয়ে একাধিক পক্ষের সঙ্গে এমন চুক্তির অভিযোগ ভবনটির মালিকানা, উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ নিয়ে বিরোধকে আরও জটিল করে তোলে।
এর সঙ্গে যুক্ত হয় জমি নিয়ে বিভিন্ন পক্ষের মামলা এবং আদালতের নিষেধাজ্ঞা। এসব কারণে নির্ধারিত সময়ে নির্মাণকাজ শেষ করতে পারেনি এজি প্রপার্টিজ। দীর্ঘসূত্রতা, আইনি জটিলতা এবং বিনিয়োগ আটকে যাওয়ায় প্রতিষ্ঠানটি আর্থিকভাবে মারাত্মক ক্ষতির মুখে পড়ে। তবু নির্মাণকাজ বন্ধ না রেখে ২০২০ ও ২০২১ সালে করোনাভাইরাস মহামারির মধ্যেও কাজ চালিয়ে যায় তারা।
ভবনটির নির্মাণকাজ দ্রুত শেষ করার জন্য দুটি ব্যাংক থেকে প্রায় ১৫০ কোটি টাকা ঋণ নেয় এজি প্রপার্টিজ। প্রতিষ্ঠানটির ভাষ্য অনুযায়ী, ২০২১ সালে নির্মাণকাজ প্রায় ৯৫ শতাংশ শেষ হয়েছিল। অর্থাৎ, বিপুল অর্থ বিনিয়োগ করে ভবনটিকে ব্যবহারযোগ্য পর্যায়ে নিয়ে যাওয়ার ঠিক সেই সময়ই নিয়ন্ত্রণ নিয়ে বিরোধ তীব্র হয়ে ওঠে। অভিযোগের কেন্দ্রে উঠে আসেন হায়দার আলী খান বহুলুল, শওকত আলী খান বিপুলসহ চার ভূমিমালিক।
এজি প্রপার্টিজের অভিযোগ, ভবনটি নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নেওয়ার উদ্দেশ্যে ওই স্থানে আওয়ামী লীগের একটি কার্যালয় স্থাপন করা হয়। এরপর কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের একটি সশস্ত্র গোষ্ঠীকে সঙ্গে নিয়ে ভূমিমালিকদের পক্ষের লোকজন নির্মাণকারী প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা-কর্মচারী ও প্রকৌশলীদের মারধর করে ভবন থেকে বের করে দেন। যা কেবল ব্যবসায়িক চুক্তি ভঙ্গের বিষয় নয়, বরং রাজনৈতিক পরিচয় ও সশস্ত্র শক্তি ব্যবহার করে একটি প্রতিষ্ঠানের বিনিয়োগ ও সম্পদের নিয়ন্ত্রণ কেড়ে নেওয়া।
হায়দার আলী খান বহুলুলের ক্ষমতার উৎস হিসেবে এজি প্রপার্টিজের অভিযোগে সামনে এসেছে তার শ্বশুর মনির চৌধুরীর নাম। তিনি কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের মাদারীপুর জেলার সাবেক জ্যেষ্ঠ সহসভাপতি এবং মাদারীপুর জেলা পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান। আরও জানা গেছে, মনির চৌধুরীর আপন চাচাতো ভাই আওয়ামী লীগের সাবেক চিফ হুইপ নূরে আলম লিটন চৌধুরী। নূরে আলম লিটন চৌধুরী রাজনৈতিক ক্ষমতার প্রভাব খাটিয়ে তাদের আমমোক্তারনামা বাতিল করান। এ ঘটনায় মিরপুর সাব-রেজিস্ট্রি অফিসের সাব-রেজিস্ট্রার নুরুল আমিনেরও যোগসাজশ ছিল।
আমমোক্তারনামা বাতিলের পর বিরোধ আরও গভীর হয়। এজি প্রপার্টিজের দাবি, ভবন থেকে তাদের সরিয়ে দেওয়ার পর পাঁচ কোটি টাকা চাঁদা দাবি করা হয়। প্রতিকূল পরিস্থিতিতে নিরুপায় হয়ে প্রতিষ্ঠানটি এক কোটি ২৪ লাখ টাকা পরিশোধ করে।
এজি প্রপার্টিজের অভিযোগ, তাদের সঙ্গে বিদ্যমান চুক্তির তোয়াক্কা করছেন না ভূমিমালিকেরা। এর ফলে ব্যাংকঋণে নির্মিত ভবনটির ওপর বিনিয়োগ করেও প্রতিষ্ঠানটি স্বাভাবিকভাবে ব্যবসা পরিচালনা করতে পারছে না। অন্যদিকে ভবনটিতে দোকান বা বাণিজ্যিক জায়গা কিনেছেন যারা, তারাও অনিশ্চয়তায় পড়েছেন। ভবনের মালিকানা ও নিয়ন্ত্রণ নিয়ে বিরোধের কারণে তাদের ব্যবসা, সম্পত্তি এবং আর্থিক নিরাপত্তা ঝুঁকির মুখে পড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
সরেজমিনে গিয়ে দেখা গেছে, ভবনের যে অংশ এজি প্রপার্টিজ ভাড়া দিয়েছিল, সেই অংশের ভাড়াটিয়াদের কাছ থেকেও ভূমিমালিকদের অংশের লোকজন জোরপূর্বক ভাড়া আদায়ের চেষ্টা করছেন। প্রশ্ন উঠেছে, চুক্তি ও আইনগত অধিকার উপেক্ষা করে অন্য পক্ষের বরাদ্দ করা জায়গা থেকে ভাড়া আদায়ের চেষ্টা করার অধিকার তাদের আছে কি না। আইনজ্ঞদের মতে, এ ধরনের পদক্ষেপ বেআইনি।
এই বিরোধের আর্থিক মাত্রাও কম নয়। এজি প্রপার্টিজের দাবি, ভবনটির বিপরীতে ব্যাংক থেকে নেওয়া ঋণের পরিমাণ প্রায় দেড় শ কোটি টাকা। নির্মাণকাজে বিপুল অর্থ ব্যয় করার পর ভবনের নিয়ন্ত্রণ হারানোয় প্রতিষ্ঠানটি একদিকে ঋণের দায় বহন করছে, অন্যদিকে বিনিয়োগের সুফল থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। ব্যাংকের ঋণ পরিশোধ, ভবনের ব্যবহার এবং ভাড়ার আয় নিয়ে অনিশ্চয়তা দীর্ঘায়িত হলে এর প্রভাব সংশ্লিষ্ট আর্থিক প্রতিষ্ঠান ও ভবনে জায়গা কেনা ব্যক্তিদের ওপরও পড়তে পারে।
২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর রাজনৈতিক ক্ষমতার কাঠামো বদলে গেলেও মিরপুর সিটি সেন্টারের বিরোধ নিষ্পত্তি না হওয়ার অভিযোগ প্রশাসনিক দায়িত্ব নিয়ে প্রশ্ন তৈরি করেছে। এজি প্রপার্টিজ ডেভেলপমেন্টস লিমিটেডের পক্ষ থেকে প্রধানমন্ত্রী ও প্রশাসনের হস্তক্ষেপ কামনা করা হয়েছে। ভবনটিতে জায়গা কেনা ভুক্তভোগীরাও সমস্যার সমাধান চান। তাদের দাবি, বিনিয়োগ, চুক্তি ও সম্পত্তির অধিকার নিয়ে সৃষ্ট সংকটের অবসান ঘটাতে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া হোক।
ডিবিসি/এসডব্লিউএন