আন্তর্জাতিক
ব্যবহারকারীদের তথ্য নিয়ে মিথ্যাচার, মেটাকে ২৫ বিলিয়ন ডলার জরিমানা

ব্যবহারকারীদের তথ্যের গোপনীয়তা নিয়ে মিথ্যাচারের দায়ে ফেসবুক, ইনস্টাগ্রাম ও হোয়াটসঅ্যাপের মূল প্রতিষ্ঠান মেটাকে ২ হাজার ৫০০ কোটি ডলার (২৫ বিলিয়ন ডলার) জরিমানা করা হয়েছে। ব্যবসায়িক কর্মকাণ্ডের জন্য এটিই মেটার ইতিহাসে সবচেয়ে বড় জরিমানা।
চলতি বছরের শুরুতে দুই সপ্তাহ ধরে চলা এক বিচারিক প্রক্রিয়ায় প্রমাণিত হয় যে, ফেসবুক ব্যবহারকারীদের তথ্য কীভাবে পরিচালনা করা হয়, তা নিয়ে মেটা বছরের পর বছর ধরে জনগণের কাছে মিথ্যা বলেছে। এরই পরিপ্রেক্ষিতে বুধবার (২১ অক্টোবর) যুক্তরাষ্ট্রের নিউ মেক্সিকো অঙ্গরাজ্যের এক বিচারক প্রতিষ্ঠানটিকে এই বিপুল অর্থ জরিমানার আদেশ দেন। বিচারক বলেন, ‘এই মিথ্যাচার শুধু ফেসবুকের তথ্য ব্যবস্থাপনার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়।’ তিনি আরও যোগ করেন যে, এগুলো ‘ফেসবুকের মূল ব্যবসায়িক কর্মকাণ্ডের কেন্দ্রবিন্দুতে’ পৌঁছে গেছে।
এই রায়ের বিষয়ে মেটার প্রধান আইনজীবী সিজে মাহোনি বলেন, এই আদেশের ফলে ‘নিউ মেক্সিকো অঙ্গরাজ্যে ব্যবসা করা একপ্রকার অসম্ভব হয়ে পড়েছে’। মেটা এই রায়ের বিরুদ্ধে আপিল করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে এবং মাহোনির দাবি, আপিলে তারা জয়ী হবেন।
চলতি বছর মেটাকে বেশ কয়েকটি মামলায় জরিমানা গুনতে হয়েছে অথবা সমঝোতায় আসতে হয়েছে। এর মধ্যে শিশুদের নিরাপত্তা ইস্যুতে ক্যালিফোর্নিয়ার সঙ্গে ১ হাজার ৮০০ কোটি ডলারের (১৮ বিলিয়ন ডলার) একটি সমঝোতা চুক্তিও রয়েছে। তবে নিউ মেক্সিকোর এই জরিমানার অঙ্ক আগের সব রেকর্ড ছাড়িয়ে গেছে।
নিউ মেক্সিকোর এই মামলার সূত্রপাত হয়েছিল বহুল আলোচিত কেমব্রিজ অ্যানালিটিকা কেলেঙ্কারি থেকে। সে সময় মেটা ‘ফেসবুক’ নামেই ব্যবসা পরিচালনা করত। রাজনৈতিক পরামর্শক প্রতিষ্ঠান কেমব্রিজ অ্যানালিটিকা লাখ লাখ ফেসবুক ব্যবহারকারীর তথ্য ব্যবহার করেছিল। ২০১৬ সালের মার্কিন প্রেসিডেন্ট নির্বাচনেও তারা এসব তথ্য কাজে লাগিয়েছিল, যে নির্বাচনে প্রথমবারের মতো ডোনাল্ড ট্রাম্প জয়ী হন।
এছাড়া নিউ মেক্সিকো অভিযোগ তুলেছিল যে, বিদ্বেষমূলক বক্তব্য রয়েছে এমন কনটেন্ট থেকে মেটা কীভাবে লাভবান হয়েছে এবং এ ধরনের কনটেন্ট ঠেকানোর নিয়মগুলো কীভাবে প্রয়োগ করা হয়েছে- সে বিষয়েও প্রতিষ্ঠানটি ইচ্ছাকৃতভাবে জনগণকে বিভ্রান্ত করেছে। জুরি বোর্ড এই অভিযোগেও মেটাকে দোষী সাব্যস্ত করেছে। তবে মেটা এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছে। মাহোনি বলেন, ‘মূলত মানুষ অনলাইনে কী বলতে পারবে, তার ওপর নতুন নিয়ম চাপিয়ে দিতে এই মামলার মাধ্যমে মতপ্রকাশের ওপর কর আরোপের চেষ্টা করা হচ্ছে।’
বছরের পর বছর ধরে মেটার শীর্ষ কর্মকর্তারা দাবি করে এসেছেন যে, ব্যবহারকারীর অনুমতি ছাড়া তাদের তথ্য কখনোই তৃতীয় পক্ষের কাছে দেওয়া হয় না বা তারা তা দেখতে পায় না। কিন্তু বাস্তবে তা ঘটেছে- এমন অসংখ্য বক্তব্যের সূত্র ধরেই নিউ মেক্সিকোর আইনজীবীরা মামলাটি করেছিলেন। তাদের দাবি, মেটার এই অসততার কারণে অঙ্গরাজ্যটির প্রায় ২০ লাখ মানুষের পুরো জনগোষ্ঠীই ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। জুরি বোর্ড দেখতে পেয়েছে যে, মেটা ৪ কোটি বারেরও বেশি সময় ধরে অঙ্গরাজ্যের আইন লঙ্ঘন করেছে।
বুধবার নিউ মেক্সিকোর অ্যাটর্নি জেনারেল রাউল তোরেজ বলেন, ‘দীর্ঘদিন ধরে শক্তিশালী প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলো এমনভাবে কাজ করেছে যেন তাদের আকার এবং প্রভাব তাদের আইনের ঊর্ধ্বে রেখেছে।’ তিনি আরও বলেন, ‘আজকের ফলাফল এটি স্পষ্ট করে দিয়েছে যে, জবাবদিহির ঊর্ধ্বে থাকার মতো শক্তিশালী কোনো করপোরেশন নেই।’
অঙ্গরাজ্যের আইনজীবীরা মেটার বিরুদ্ধে সর্বোচ্চ ৪ হাজার কোটি ডলার জরিমানা চেয়েছিলেন। অন্যদিকে মেটার যুক্তি ছিল, ৩৪০ কোটি ডলারের বেশি যেকোনো জরিমানাই অসাংবিধানিক হবে। তবে বুধবার বিচারক ফ্রান্সিস ম্যাথিউ সরাসরি মেটার প্রতি প্রান্তিকের (তিন মাস) মুনাফার প্রায় সমপরিমাণ অর্থ জরিমানা করার সিদ্ধান্ত নেন। তিনি বলেন, ২০১০ থেকে ২০২১ সাল পর্যন্ত ‘১১ বছরেরও বেশি সময়’ ধরে মেটা যেভাবে আইন লঙ্ঘন করেছে এবং ফেসবুক তথ্যের ব্যবহার ও আদান-প্রদান নিয়ে জনগণকে ভুল তথ্য দিয়েছে, তা ছিল ‘ইচ্ছাকৃত’।
বিচারক ম্যাথিউ তার আদেশে লিখেছেন, মার্ক জাকারবার্গসহ শীর্ষ নির্বাহীদের মধ্যকার কথোপকথনগুলো ‘জনগণকে বিভ্রান্ত করার উদ্দেশ্যেই সাজানো হয়েছিল’। অঙ্গরাজ্যের আইন লঙ্ঘনের হাজার হাজার ঘটনার ওপর ভিত্তি করে মেটার মোট জরিমানার পরিমাণ দাঁড়িয়েছিল ২১ হাজার ৯০০ কোটি ডলার। তবে বিচারক ম্যাথিউ তা কমিয়ে ২ হাজার ৫০০ কোটি ডলারে নামিয়ে আনেন। এর আগে ২০১৯ সালে তথ্যের গোপনীয়তা ইস্যুতে যুক্তরাষ্ট্রের ফেডারেল ট্রেড কমিশন মেটাকে ৫০০ কোটি ডলার জরিমানা করেছিল।
আদালতে মেটার সবচেয়ে বড় প্রতিপক্ষগুলোর একটি হয়ে উঠেছে নিউ মেক্সিকো। শিশুদের জন্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম কতটা নিরাপদ, তা নিয়ে জনগণকে বিভ্রান্ত করায় চলতি বছরই অঙ্গরাজ্যটি মেটাকে প্রায় ১০০ কোটি ডলার জরিমানা করেছে। ওই মামলার বিচারক মেটাকে পরিবেশ দূষণকারী শিল্পপ্রতিষ্ঠানের সঙ্গে তুলনা করে বলেছিলেন, মেটার দূষণের ধরন হলো ‘শিশুদের মানসিক ক্ষতি এবং যৌন নিপীড়ন’।
মেটার ওপর এই জরিমানার অঙ্ক যত বড়ই হোক না কেন, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই (AI) প্রযুক্তির দৌড়ে অন্যান্য প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে পাল্লা দিতে অবকাঠামো খাতে এর চেয়েও অনেক বেশি অর্থ ব্যয় করছে প্রতিষ্ঠানটি। আর্থিক বিশ্লেষকদের সঙ্গে এক আলাপকালে মার্ক জাকারবার্গ জানান, মেটার গ্রাহক-কেন্দ্রিক এআই টুল ‘মিউজ’ (Muse) ইতোমধ্যে ১ কোটি মানুষ ব্যবহার করছেন। জাকারবার্গ বলেন, ‘কোটি কোটি মানুষের কাছে সেবা পৌঁছে দিতে মিউজকে আরও বড় করে তোলাই আমাদের লক্ষ্য এবং কৌশল।’
সেই লক্ষ্যে চলতি বছর মূলত এআই প্রকল্পগুলোতেই অন্তত ১৩ হাজার ৫০০ কোটি ডলার খরচের পরিকল্পনা করেছে মেটা, যা বেড়ে ১৪ হাজার ৫০০ কোটি ডলারেও পৌঁছাতে পারে। এআই খাতে বিপুল অর্থ ব্যয়ের কারণে মেটার নগদ অর্থের প্রবাহে (ক্যাশ ফ্লো) ২০০ কোটি ডলারের বেশি ঘাটতি দেখা দিয়েছে। বিবিসির এক পর্যালোচনায় দেখা গেছে, ১৪ বছর আগে শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত হওয়ার পর মেটার ইতিহাসে এমন ঘটনা সম্ভবত এই প্রথম। মূলত ব্যবসা পরিচালনা ও বিনিয়োগের খরচ মেটানোর পর একটি প্রতিষ্ঠানের হাতে যে অর্থ থাকে, সেটিই ক্যাশ ফ্লো। অর্থাৎ, মেটা এখন আগের চেয়ে অনেক বেশি আয় করলেও, আয়ের চেয়ে ব্যয় করছে বেশি।
গত বছরের একই সময়ের তুলনায় জুলাই থেকে সেপ্টেম্বর প্রান্তিকে মেটার আয় ২৬ শতাংশ বেড়ে ৬ হাজার ৪৫০ কোটি ডলারে দাঁড়িয়েছে। এ সময় প্রতিষ্ঠানটির মুনাফাও তিন গুণ বেড়ে ৯৮০ কোটি ডলারে পৌঁছেছে। তবুও এআই খাতে বিনিয়োগ আরও বাড়াতে চায় প্রতিষ্ঠানটি। মেটার প্রধান অর্থ কর্মকর্তা (সিএফও) সুসান লি শেয়ারের নতুন বিভাজনের (স্টক স্প্লিট) ঘোষণা দিয়েছেন। এর আওতায় মেটার বর্তমান শেয়ারহোল্ডাররা ভোটাধিকারহীন স্টকের বিপরীতে একটি করে নতুন শেয়ার পাবেন। লি জানান, নতুন এই শেয়ার নির্দিষ্ট কোনো বিনিয়োগের জন্য করা হয়নি। তবে এআই সংক্রান্ত চলমান খরচের ইঙ্গিত দিয়ে তিনি বলেন, আগামী বছর প্রতিষ্ঠানটির ‘তহবিল সংগ্রহে আরও নমনীয়তার’ প্রয়োজন হতে পারে।
সূ্ত্র: বিবিসি
ডিবিসি/ এসভিএন