সারা বাংলা
কিশোরগঞ্জে সংসদ সদস্যের পিএকে ঘিরে বিএনপিতে দ্বন্দ্ব, ২ নেতাকে পঙ্গু করার হুমকির অভিযোগ

কিশোরগঞ্জের করিমগঞ্জে বিএনপির সংসদ সদস্য ও সাবেক শিক্ষামন্ত্রী ড. এম ওসমান ফারুকের ব্যক্তিগত সহকারী মেজবাহউদ্দিন টুটুলের সমালোচনা করায় বিএনপির দুই নেতাকে হাত-পা ভেঙে পঙ্গু করে দেওয়া এবং হতাহত করার হুমকির অভিযোগ উঠেছে ইউনিয়ন বিএনপির এক নেতার বিরুদ্ধে।
একই সভায় আরেক বিএনপি নেতাকেও হাত-পায়ের রগ কেটে দেওয়ার হুমকি দিতে শোনা গেছে বলে অভিযোগ রয়েছে। এ-সংক্রান্ত একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পর স্থানীয় রাজনৈতিক অঙ্গনে ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনার সৃষ্টি হয়েছে।
অভিযুক্তরা হলেন করিমগঞ্জ উপজেলার গুণধর ইউনিয়ন বিএনপির সহসভাপতি সিরাজুল ইসলাম এবং গুণধর ইউনিয়ন পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান ও উপজেলা বিএনপির সদস্য তোফায়েল আহম্মদ জাহিদ।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিডিওতে দেখা যায়, দলীয় সভায় বক্তব্য দিচ্ছেন গুণধর ইউনিয়ন বিএনপির সহসভাপতি সিরাজুল ইসলাম। বক্তব্যের একপর্যায়ে তিনি সংসদ সদস্য ওসমান ফারুকের ব্যক্তিগত সহকারী মেজবাহউদ্দিন টুটুলের সমালোচনাকারীদের বিরুদ্ধে ক্ষোভ প্রকাশ করেন।
এ সময় উপজেলা বিএনপির সাংগঠনিক সম্পাদক রুনু দরবারী ও সাবেক ছাত্রদল নেতা তাজুল ইসলামের নাম উল্লেখ করে তাঁদের যেখানে পাওয়া যাবে, সেখানেই ‘হতাহত’ করা এবং হাত-পা ভেঙে পঙ্গু হাসপাতালে পাঠানোর হুমকি দিতে শোনা যায় তাঁকে।
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, গত শুক্রবার বিকেলে গুণধর ইউনিয়ন বিএনপির কার্যালয়ে ওই সভা অনুষ্ঠিত হয়। পরে সিরাজুল ইসলামের নিজের ফেসবুক অ্যাকাউন্টে ভিডিওটি প্রকাশ করা হলে তা দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে।
একই সভায় বক্তব্য দেন গুণধর ইউনিয়ন পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান ও উপজেলা বিএনপির সদস্য তোফায়েল আহম্মদ জাহিদ। ভিডিওতে তাঁকে বলতে শোনা যায়, ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান নির্বাচন থেকে শুরু করে স্কুল-মাদ্রাসার পরিচালনা কমিটি, জলমহাল ও বাজারের নিয়ন্ত্রণ-সবকিছুই তাঁরা নির্ধারণ করবেন।
টুটুলের সমালোচনাকারীদের উদ্দেশে জাহিদ আরও বলেন, তাঁদের কাছে জবাবদিহি করতে হবে। কাউকে পেলে হাত-পায়ের রগ কেটে থানায় সোপর্দ করার হুমকি দেওয়ার অভিযোগও উঠেছে তাঁর বিরুদ্ধে।
এদিকে তোফায়েল আহম্মদ জাহিদ স্ত্রী হত্যা মামলায় যাবজ্জীবন কারাদণ্ডপ্রাপ্ত ছিলেন বলে জানা গেছে। সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, ১৩ বছর কারাভোগের পর তিনি বর্তমানে জামিনে রয়েছেন। অন্যদিকে সিরাজুল ইসলামের চাচাতো ভাই মো. আতিকুল্লাহ বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন-সংক্রান্ত একটি হত্যা মামলার পলাতক আসামি বলে অভিযোগ রয়েছে। তবে এসব তথ্য সংশ্লিষ্ট আদালত ও পুলিশের নথি থেকে স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি।
হুমকির শিকার হওয়ার অভিযোগ তুলে সাবেক ছাত্রদল নেতা তাজুল ইসলাম বলেন, ‘ওরা যেকোনো সময় আমাকে মেরে ফেলতে পারে। এর আগে গত ঈদের দিন ঈদের জামাতে আমাকে আক্রমণ করার জন্য অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে ঘেরাও করেছিল। গ্রামবাসী আমাকে রক্ষা করেন।’
তাজুল ইসলামের দাবি, গুণধর ইউনিয়নের উরদিঘী আলিম মাদ্রাসার জমি নিয়ে বিরোধের জেরে সিরাজুল ইসলাম ও তাঁর স্বজনেরা তাঁর ওপর ক্ষুব্ধ।
তিনি অভিযোগ করেন, মাদ্রাসার ৮৮ শতাংশ জমি দীর্ঘদিন ধরে সিরাজুল ইসলাম ও তাঁর স্বজনদের দখলে ছিল। অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময় মাদ্রাসার অ্যাডহক কমিটির সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে তিনি আদালতের মাধ্যমে জমিটি উদ্ধারের উদ্যোগ নেন। সম্প্রতি আদালতের রায়ে জমিটি মাদ্রাসার দখলে ফিরে আসার পর থেকেই তাঁকে হত্যাসহ বিভিন্ন ধরনের হুমকি দেওয়া হচ্ছে।
তাজুল ইসলাম বলেন, এসব ঘটনায় তিনি ও তাঁর পরিবার চরম নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন। জীবনের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে প্রশাসনের সহযোগিতা কামনা করেন তিনি।
হুমকিমূলক বক্তব্যের বিষয়ে জানতে চাইলে তোফায়েল আহম্মদ জাহিদ অভিযোগ অস্বীকার করেন। তিনি দাবি করেন, সভায় তিনি এ ধরনের কোনো বক্তব্য দেননি। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিডিওটি সম্পাদনা করা হয়ে থাকতে পারে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
অন্যদিকে গুণধর ইউনিয়ন বিএনপির সহসভাপতি সিরাজুল ইসলাম বলেন, সংসদ সদস্য ওসমান ফারুকের ব্যক্তিগত সহকারী টুটুলের বিরুদ্ধে সমালোচনার প্রতিবাদ জানাতে দলীয় কার্যালয়ে একটি বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়েছিল। সেখানে উপস্থিত অনেকেই বক্তব্য দিয়েছেন। কিন্তু উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে শুধু তাঁর বক্তব্য সামনে আনা হচ্ছে বলে দাবি করেন তিনি।
ভিডিওতে হুমকিমূলক বক্তব্যের বিষয়ে জানতে চাইলে সিরাজুল বলেন, ভিডিওটি দেখলেই বোঝা যাবে তিনি কী বলেছেন।
এ বিষয়ে গুণধর ইউনিয়ন বিএনপির সভাপতি মো. আশরাফ আলী বলেন, রাজনীতিতে মতবিরোধ ও সমালোচনা থাকতেই পারে। কিন্তু সেই বিরোধের জেরে কাউকে হতাহত করা, হাত-পা ভেঙে দেওয়া কিংবা হাত-পায়ের রগ কেটে ফেলার মতো বক্তব্য কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। তিনি এ ধরনের বক্তব্য সমর্থন করেন না।
স্থানীয় বিএনপির একাংশের নেতাকর্মীদের অভিযোগ, ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিজয়ের পর গত আট মাসে নির্বাচনী এলাকা করিমগঞ্জ ও তাড়াইলে সংসদ সদস্য ড. এম ওসমান ফারুকের উপস্থিতি তুলনামূলক কম ছিল। এ সময়ে তাঁর ব্যক্তিগত সহকারী মেজবাহউদ্দিন টুটুলের ভূমিকা নিয়ে দলের একটি অংশের মধ্যে অসন্তোষ তৈরি হয়েছে।
বিশেষ করে দুই উপজেলায় সার ডিলার নিয়োগ এবং বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের অ্যাডহক কমিটির সভাপতি নিয়োগকে কেন্দ্র করে টুটুলের বিরুদ্ধে দুর্নীতি, প্রভাব বিস্তার ও অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ তুলেছেন কয়েকজন নেতাকর্মী।
এসব অভিযোগ নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও সমালোচনা চলছে। তবে অভিযোগগুলোর সত্যতা স্বাধীনভাবে নিশ্চিত করা যায়নি।
অভিযোগের বিষয়ে বক্তব্য জানতে মেজবাহউদ্দিন টুটুলের সঙ্গে একাধিকবার মুঠোফোন ও হোয়াটসঅ্যাপে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাঁর বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
এদিকে দলীয় নেতাদের প্রকাশ্যে হুমকিমূলক বক্তব্যের ভিডিও ছড়িয়ে পড়ায় করিমগঞ্জের রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন করে উত্তেজনা সৃষ্টি হয়েছে। স্থানীয় নেতাকর্মীদের একাংশের মতে, রাজনৈতিক মতবিরোধ ও ব্যক্তিগত বিরোধকে কেন্দ্র করে এ ধরনের প্রকাশ্য হুমকি দলের অভ্যন্তরীণ শৃঙ্খলা ও স্থানীয় আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির জন্য উদ্বেগজনক।
হুমকির শিকার হওয়ার অভিযোগ তোলা নেতারা নিজেদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার পাশাপাশি ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত এবং জড়িতদের বিরুদ্ধে সাংগঠনিক ও আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানিয়েছেন।
ডিবিসি/এমএনকে