বিবিধ
প্রযুক্তিগত উন্নয়নে আমাদের মেধাবী তরুণদের চলমান অগ্রযাত্রা এবং বাস্তব চ্যালেঞ্জ!

বর্তমানে দেখা যায় যে, বিশ্বের যে দেশগুলো শিক্ষা ও গবেষণায় পিছিয়ে রয়েছে, বাস্তবে সে দেশগুলো অর্থনৈতিক, প্রযুক্তি ও শিল্প উন্নয়নেও পিছিয়ে রয়েছে। এক্ষেত্রে বাংলাদেশও কোনো ব্যতিক্রম নয়, বরং উন্নত বিশ্বের মাপকাঠিতে বিশ্বমানের শিক্ষা, গবেষণা ও প্রযুক্তিগত উন্নয়নে বড় ধরনের চ্যালেঞ্জ ও প্রতিবন্ধকতা আজও মোকাবিলা করে যাচ্ছে।
তবে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে আমাদের দেশের উচ্চস্তরের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে সীমিত পরিসরে হলেও উদ্ভাবন ও গবেষণা এগিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছে। বর্তমানে আমাদের বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ের মেধাবী তরুণদের একাধিক উদ্ভাবন, গবেষণা এবং ইনোভেটিভ আইডিয়া আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় ব্যাপক সাফল্য অর্জন করছে। বিশেষ করে তাদের নিজেদের তৈরি রোবট, এআইচালিত গাড়ি কিংবা আধুনিক প্রযুক্তির প্রদর্শনীতে বিশ্বমঞ্চে শীর্ষ স্থান অধিকার করে তারা দেশের জন্য অনন্য গৌরব বয়ে আনছেন।
আমাদের দেশের প্রতিভাবান তরুণদের এই অভাবনীয় মেধা, পরিশ্রম ও লড়াকু মানসিকতার ওপর নির্ভর করে বলাই যায় যে, অদূর ভবিষ্যতে আমাদের দেশের নিজস্ব প্রযুক্তিগত উন্নয়ন ও গবেষণার ক্ষেত্রটি অনেক দূর এগিয়ে যাবে। আর তাদের নতুন ইনোভেটিভ আইডিয়া, উদ্ভাবিত প্রযুক্তি ও ডিভাইসগুলোর গল্প সোশ্যাল মিডিয়াতেও সর্বস্তরের মানুষের মাঝে ব্যাপক সুনাম ও সাড়া ফেলে দিয়েছে।
তবে এই উজ্জ্বল সম্ভাবনার পাশাপাশি একটি হতাশাজনক সত্যও আমাদের সামনে এখন দৃশ্যমান। আমাদের তরুণদের ইনোভেটিভ আইডিয়া কিংবা উদ্ভাবিত প্রযুক্তি বা সিস্টেমগুলোর প্রায় ৯০ থেকে ৯৫ শতাংশই ল্যাবরেটরির বাইরে সাধারণ মানুষের ব্যবহারের উপযোগী হয়ে দেশের শিল্পকারখানায় বাণিজ্যিকভাবে উৎপাদিত হতে পারছে না। তবে নানা সীমাবদ্ধতা থাকা সত্ত্বেও কৃষি সেক্টরে গবেষণা ও উন্নয়নে যথেষ্ট সুনাম অর্জন করেছে বাংলাদেশ।
সোজা কথায়, বর্তমানে সামগ্রিকভাবে আমাদের তরুণদের উদ্ভাবনগুলো দেশের বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিগত বাণিজ্যিক উৎপাদনে সরাসরি প্রভাব বিস্তার করতে ব্যর্থ হচ্ছে। মেধাবী তরুণদের চলমান এই অভাবনীয় সাফল্যের পরও বাস্তবে অধিকাংশ ক্ষেত্রেই তার বাণিজ্যিক রূপান্তরের কোনো ইতিবাচক নজির খুঁজে না পাওয়াটা সত্যিই বেদনাদায়ক। নতুন কোনো আইডিয়া বা আবিষ্কার যদি সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবনের অংশ না হতে পারে, তবে তার আসল কার্যকারিতা ও বাস্তব গ্রহণযোগ্যতা কালের স্রোতে অনেকটাই হারিয়ে যায়।
ফলে দেশের মেধাবীদের এই সৃজনশীল গবেষণা, উদ্ভাবন এবং প্রচেষ্টা কেবলই সোশ্যাল মিডিয়ার সাময়িক খ্যাতি ও প্রশংসা কিংবা আন্তর্জাতিক সনদ ও পুরস্কার প্রাপ্তির বৃত্তেই সীমাবদ্ধ থেকে যাচ্ছে। যা আমাদের দেশের বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিগত সামগ্রিক উন্নয়ন এবং নিজস্ব প্রযুক্তিনির্ভর একটি টেকসই শিল্পায়ন ও অর্থনৈতিক উন্নয়নের পথে বড় বাধা হিসেবে রয়ে গেছে।
আমাদের মনে রাখতে হবে, যেকোনো দেশের দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির জন্য নিজস্ব উদ্ভাবিত গবেষণা ও প্রযুক্তিগত উন্নয়নের সাথে বাস্তব শিল্প খাতের একটি নিবিড় সমন্বয় ও সরাসরি যোগাযোগ গড়ে তোলা জরুরি। আমাদের মেধাবী তরুণদের উদ্ভাবন আর আবিষ্কারগুলোকে যদি আমরা দেশীয় শিল্পকারখানার সাথে যুক্ত করতে না পারি, তবে তাদের এই কঠোর পরিশ্রম ও মেধার ফসল একসময় অন্ধকারেই হারিয়ে যাবে।
তাই যেকোনো নতুন প্রযুক্তির আসল মূল্য তখনই প্রমাণিত হয়, যখন তা শতভাগ না হলেও আংশিক পর্যায়ে বাণিজ্যিকভাবে উৎপাদন প্রক্রিয়ায় গিয়ে দেশের অর্থনীতি ও সাধারণ মানুষের কাজে ভূমিকা রাখে। দেশের শিল্পোদ্যোক্তা ও তরুণ গবেষকদের মধ্যকার এই কার্যকর মেলবন্ধনই হতে পারে আমাদের মেধাকে বিশ্বমঞ্চের পাশাপাশি দেশের মাটিতেও সত্যিকারের বিজয়ী করে তুলতে।
অত্যন্ত দুঃখজনক হলেও সত্য যে, নিজ দেশে মেধাবীদের সঠিক মূল্যায়ন করতে না পারলে এবং তাদের বাস্তব গবেষণার ক্ষেত্রকে কাজে লাগাতে না পারলে তারা একসময় ক্লান্ত হয়ে ভিন্ন পথ ও পেশা বেছে নেবেন। অন্যদিকে সুযোগ পেলে হয়তো নিজের মেধা ও সৃজনশীলতাকে পুঁজি করে একটু সুন্দর ও নিরাপদ জীবনের আশায় বিদেশে পাড়ি জমানোর মতো কঠিন সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য হন। যাকে আমরা 'মেধা পাচার' বা 'ব্রেইন ড্রেইন' যাই বলি না কেন- এটাই হচ্ছে আমাদের বর্তমান রূঢ় বাস্তবতা।
তাই একবিংশ শতাব্দীর চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা এবং উন্নত বিশ্বের সাথে তাল মিলিয়ে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিগত উন্নয়নে পৌঁছাতে হলে এখন সবার আগে আমাদের দেশের মেধাবীদের জন্য কাজের একটি সুন্দর পরিবেশ, উচ্চস্তরের গবেষণার ক্ষেত্র এবং তাদের সম্মানজনক কর্মসংস্থানের সুনিশ্চয়তা নিশ্চিত করতে হবে। এর পাশাপাশি দেশের প্রান্তিক পর্যায়ে গবেষণা ও উন্নয়নে (R&D) বিনিয়োগ বৃদ্ধি ও অবকাঠামো গড়ে তুলতে হবে।
আশার কথা হলো, আমাদের বর্তমান সরকার সেই লক্ষ্য অর্জনে এগিয়ে যাওয়ার সর্বোচ্চ চেষ্টা করে যাচ্ছে। এর ধারাবাহিকতায় চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিগত উন্নয়নে বরাদ্দের ক্ষেত্রে একটি ইতিবাচক পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে। এই নতুন বাজেটে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের জন্য ১৮,১১৫ কোটি টাকা, গবেষণা ও নীল অর্থনীতির জন্য ২০০ কোটি টাকা, এবং স্টার্টআপ ফান্ডে ৫০০ কোটি টাকা বরাদ্দের প্রস্তাব করা হয়েছে।
এর পাশাপাশি আমাদের দেশের কারিগরি শিক্ষার মানোন্নয়নে আটটি কারিগরি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান আধুনিকায়ন এবং দেশে একটি যৌথ কারিগরি ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে সমঝোতা স্মারক (MoU) স্বাক্ষর করেছে বাংলাদেশ ও চীন। এই উদ্যোগের মাধ্যমে কারিগরি শিক্ষার অবকাঠামো উন্নয়ন, প্রযুক্তিনির্ভর শিক্ষা সম্প্রসারণ এবং দক্ষ জনশক্তি গড়ে তোলার নতুন সুযোগ তৈরি হতে পারে।
পরিশেষে বলা যায়, দেশের উচ্চশিক্ষার সকল স্তরে মৌলিক বিজ্ঞান, গবেষণা ও প্রযুক্তিকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে চীন কিংবা ভিয়েতনামের মতো পরিকল্পিত ও কৌশলগতভাবে আমাদের এগিয়ে যেতে হবে। আর সেজন্য অবশ্যই সবার আগে দ্রুত টেকসই পরিকল্পনা গ্রহণ, পর্যাপ্ত বিনিয়োগ এবং আধুনিক অবকাঠামো স্থাপনের মাধ্যমে শিল্প খাতের সাথে নিবিড় সমন্বয় গড়ে তুলতে হবে। তা না হলে, বিশ্বমানের গবেষণা, শিল্পায়ন কিংবা নিজস্ব প্রযুক্তিগত উন্নয়নে ইতিবাচক কোনো কিছু অর্জন করার সম্ভাবনা ও পথ চিরতরে রুদ্ধ হয়ে পড়বে।
সিরাজুর রহমান
শিক্ষক ও বিজ্ঞান-প্রযুক্তি বিষয়ক লেখক
সিংড়া, নাটোর, বাংলাদেশ।
ডিবিসি/এসভিএন