আন্তর্জাতিক
ফ্রান্সজুড়ে তীব্র বিক্ষোভে পুলিশসহ বেশ কয়েকজন আহত, গ্রেপ্তার ৫৬৫

শিক্ষা খাতের সংকট, জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি এবং সরকারের বিভিন্ন নীতির প্রতিবাদে টানা তৃতীয় সপ্তাহের মতো উত্তাল হয়ে উঠেছে ফ্রান্স। শনিবার (৩১ অক্টোবর) রাজধানী প্যারিসসহ দেশটির বিভিন্ন শহরে রাস্তায় নেমে বিক্ষোভ ও সমাবেশ করেছেন লাখো মানুষ। দিনের সিংহভাগ সময় কর্মসূচি শান্তিপূর্ণ থাকলেও শেষভাগে রাজধানীসহ কয়েকটি শহরে পুলিশের সঙ্গে বিক্ষোভকারীদের সংঘর্ষ, অগ্নিসংযোগ ও ভাঙচুরের ঘটনা ঘটে। সর্বশেষ সরকারি হিসাব অনুযায়ী, দেশজুড়ে ৫৬৫ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
মূলত শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের সংকট, শিক্ষার্থীদের ওপর আর্থিক চাপ এবং সুযোগের বৈষম্যের প্রতিবাদে তরুণ ও শিক্ষার্থী সংগঠনগুলোর ডাকে এই আন্দোলনের সূচনা হয়। পরবর্তীতে এর সঙ্গে যুক্ত হয় বিভিন্ন শ্রমিক সংগঠন ও সাধারণ নাগরিক। নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য, জ্বালানি ও বিদ্যুতের লাগামহীন মূল্যবৃদ্ধির পাশাপাশি সরকারের একাধিক নীতি প্রত্যাহারের দাবি জোরালো হলে আন্দোলন দেশব্যাপী ছড়িয়ে পড়ে।
শনিবারের কর্মসূচি ঘিরে রাজধানী প্যারিসে মিছিলের পথ নির্ধারণ নিয়ে প্রশাসনের সঙ্গে আয়োজকদের আইনি লড়াই হয়। আয়োজকরা ঐতিহাসিক বাস্তিল থেকে ন্যাশন পর্যন্ত মিছিল করতে চাইলেও নাশকতা ও লুটপাটের আশঙ্কায় পুলিশ তা নাকচ করে বিকল্প রুট (পোর্ত দ্য ব্যানোলে থেকে পোর্ত দ্য শ্যারেন্তোঁ) নির্ধারণ করে দেয়। আয়োজকরা এর বিরুদ্ধে প্রশাসনিক আদালতে গেলে আদালত পুলিশের নিষেধাজ্ঞা তুলে নেন। তবে প্যারিস পুলিশ প্রশাসন তাৎক্ষণিকভাবে দেশটির সর্বোচ্চ প্রশাসনিক আদালত ‘কঁন্সাই দেতা’য় (Conseil d'État) আপিল করলে আগের রায় বাতিল হয়। ফলে প্রশাসনের নির্দেশিত বিকল্প পথেই মিছিল করতে বাধ্য হন বিক্ষোভকারীরা।
বিক্ষোভে অংশগ্রহণকারীর সংখ্যা নিয়ে সরকার ও আয়োজকদের মধ্যে মতভেদ রয়েছে। দেশটির স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের দাবি, দেশজুড়ে প্রায় ৩ লাখ ২০ হাজার মানুষ বিক্ষোভে অংশ নেন, যার মধ্যে প্যারিসে ছিলেন প্রায় ৭০ হাজার। অন্যদিকে যুব সংগঠনগুলোর আন্তঃসিন্ডিক্যাল জোটের দাবি, দেশজুড়ে পাঁচ লাখের বেশি মানুষ রাজপথে নামেন, যার মধ্যে কেবল প্যারিসেই উপস্থিত ছিলেন প্রায় দুই লাখ।
প্যারিসে শান্তিপূর্ণভাবে মিছিল এগিয়ে চললেও বিকেলের দিকে পোর্ত দ্য শ্যারেন্তোঁ এলাকায় উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে। কয়েকশ বিক্ষোভকারী পুলিশের ওপর ইটপাটকেল, কাচের বোতল ও আতশবাজি নিক্ষেপ করে। নিরাপত্তা বাহিনীকে লক্ষ্য করে মলোটভ ককটেলও ছোড়া হয়। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পুলিশ কাঁদানে গ্যাস ও সাউন্ড গ্রেনেড ব্যবহার করে। এ সময় এক পুলিশ সদস্য আহত হন, যাকে ‘হত্যাচেষ্টা’ বলে আখ্যায়িত করেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী লরাঁ নুনেজ। ফরাসি সংবাদমাধ্যম ‘ল্য প্যারিজিয়ান’-এর প্রকাশিত ভিডিওতে অন্তত দুই নিরাপত্তা সদস্যের শরীরে আগুন ধরে যাওয়ার দৃশ্য দেখা যায়। রাতে প্যারিসের রিপাবলিক চত্বরে আবর্জনার স্তূপ, একটি কিয়স্ক ও একটি গাড়িতে অগ্নিসংযোগের ঘটনাও ঘটে।
রাজধানীর বাইরে গ্রেনোবল শহরে পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষে অন্তত দুজন তরুণ আহত হন। এছাড়া লিয়োঁতে এক বিক্ষোভকারী পায়ে গুরুতর আঘাত পেয়ে হাসপাতালে ভর্তি হন এবং মার্সেইয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পুলিশ টিয়ার গ্যাস ব্যবহার করে।
বিক্ষোভ নিয়ন্ত্রণে রাখতে দেশজুড়ে প্রায় ৭০ হাজার পুলিশ ও নিরাপত্তা সদস্য মোতায়েন ছিল। দিনভর প্রায় ৪০ হাজার মানুষের পরিচয় যাচাই করা হয়, যার মধ্যে ইল-দ্যো-ফ্রাঁস অঞ্চলেই যাচাই করা হয় ১৫ হাজার জনকে। দিন গড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে আটকের সংখ্যা বাড়তে থাকে; সর্বশেষ রাত ৯টার হিসাব অনুযায়ী দেশজুড়ে গ্রেপ্তারকৃতের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৫৬৫ জনে।