আন্তর্জাতিক
সস্তায় পাওয়ার আশায় ভুতুড়ে বাড়ি কিনছে জাপানের মানুষ

জাপানে জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধির কারণে অনেকেই এখন সস্তায় বাসস্থান পেতে 'ভুতুড়ে বাড়ি' বা কলঙ্কিত সম্পত্তি ভাড়া নিচ্ছেন বা কিনছেন।
টোকিওতে বসবাসকারী রিউয়া এমনই একজন, যিনি জেনে-বুঝেই এক 'ভুতুড়ে' অ্যাপার্টমেন্টে বাস করছেন। টোকিওতে ভাড়া নেওয়া অ্যাপার্টমেন্টে প্রথমবার ঢুকেই রিউয়া বুঝতে পেরেছিলেন জায়গাটা ভুতুড়ে।
তিনি বলেন, 'আমি যখন জায়গাটা দেখতে গিয়েছিলাম, তখন সেখানে একজন লোক দাঁড়িয়ে আমার দিকে কটমট করে তাকাচ্ছিল। যেহেতু এস্টেট এজেন্ট তাকে দেখতে পাচ্ছিল না, আমি বুঝতে পারলাম সে নিশ্চয়ই একটা ভূত।' অন্য কেউ হলে হয়তো ভয় পেয়ে পালিয়ে যেত, কিন্তু রিউয়া সেখানে থাকার সিদ্ধান্ত নেন। তিনি বলেন, 'আমি একটু ভিন্নমতাবলম্বী। তাই আমি এই জ্বলজ্বলে পুরুষ ভূতটার সাথে বন্ধুত্ব করার সিদ্ধান্ত নিলাম।' চার বছর পর আজও তিনি সেই অ্যাপার্টমেন্টে আছেন এবং প্রায় প্রতিদিনই ভূতের পায়ের শব্দ বা কথা শুনতে পান।
জাপানে হ্যালোইনের মতো উৎসবের পাশাপাশি সারা বছরই ভূতকে বেশ গুরুত্ব দেওয়া হয়। সেখানে 'ইউরেই' নামক একটি শব্দ প্রচলিত, যার অর্থ দীর্ঘস্থায়ী ও অশান্ত আত্মা। সাধারণত খুন, আত্মহত্যা বা নিঃসঙ্গ অবস্থায় মারা যাওয়া মানুষের আত্মাকে ইউরেই বলা হয়। যারা এসব নিয়ে কুসংস্কারাচ্ছন্ন নন, তাদের জন্য এমন বাড়ি সস্তায় পাওয়ার এক দারুণ সুযোগ। জাপানে এ ধরনের বাড়িগুলোকে বলা হয় 'জিকো বুক্কেন' বা কলঙ্কিত সম্পত্তি।
২০২১ সালের সরকারি নির্দেশনা অনুযায়ী, জাপানি রিয়েল এস্টেট এজেন্টদের আত্মহত্যা, খুন বা নিঃসঙ্গ মৃত্যুর তথ্য প্রকাশ করতে হয়। ভাড়ার ক্ষেত্রে এটি তিন বছর এবং বিক্রির ক্ষেত্রে অনির্দিষ্টকালের জন্য প্রযোজ্য।
রিউয়া জেনেছিলেন যে তার অ্যাপার্টমেন্টে একজন লোক আত্মহত্যা করেছিল। আর এ কারণেই সেতাগায়ার মতো অভিজাত এলাকায় তিনি প্রায় ৩০ শতাংশ ছাড়ে বাসাটি ভাড়া পান। তার মাসিক ভাড়া ৬২ হাজার ইয়েনের বদলে মাত্র ৪৫ হাজার ইয়েন।
টোকিওর এস্টেট এজেন্ট এরিক ওসক্যাম্প জানান, জাপানিরা কলঙ্কিত সম্পত্তির বিষয়ে বেশ কুসংস্কারাচ্ছন্ন।
তিনি বলেন, 'কবরস্থানের পাশের একটি অ্যাপার্টমেন্টও ভাড়া দেওয়া কঠিন হবে, বিশেষ করে যদি রান্নাঘর থেকে কবরগুলো দেখা যায়। সবচেয়ে খারাপ ব্যাপার হলো যদি অ্যাপার্টমেন্টে কোনো আত্মহত্যার ঘটনা ঘটে থাকে। এমনকি কেউ ছাদ থেকে ঝাঁপ দিলেও অনেক ভাড়াটে বাসা ছেড়ে চলে যাবেন। অন্যান্য সমস্যার মধ্যে রয়েছে কোনো গুরুতর অপরাধ বা নিঃসঙ্গ মৃত্যু।'
নিঃসঙ্গ মৃত্যুর কারণে সম্পত্তির দাম কমে যাওয়ার আরেকটি উদাহরণ হলেন ডায়ান টিঞ্চার। ৭৯ বছর বয়সী এই আমেরিকান প্রায় ৪০ বছর ধরে জাপানে বসবাস করছেন। তিনি জাপানের দক্ষিণাঞ্চলের কাগেশিমায় একটি তিন বেডরুমের বাড়ি প্রায় অর্ধেক দামে কিনেছেন। বাড়িটিতে একজন বয়স্ক নারী একা মারা গিয়েছিলেন। সাড়ে চার কোটি ইয়েন দামের বাড়িটি টিঞ্চার মাত্র দুই কোটি ইয়েনে কিনেছেন।
তিনি বলেন, 'আমি ভূতে বিশ্বাস করি না। কিন্তু আমি জানি যে জাপানিরা খুব কুসংস্কারাচ্ছন্ন। যদি সত্যিই কোনো ভূত থাকে, তবে আমি প্রতিদিন তার কাছে কৃতজ্ঞ, এমন চমৎকার ও সাশ্রয়ী একটি বাড়িতে বাস করার জন্য।'
টিঞ্চার বাড়িটি 'ওশিমাল্যান্ড' নামের একটি ওয়েবসাইটের মাধ্যমে খুঁজে পেয়েছিলেন। ২০০৫ সালে তেরু ওশিমা এটি চালু করেন, যেখানে জিকো বুক্কেন বা কলঙ্কিত সম্পত্তির তথ্য দেওয়া থাকে।
তেরু ওশিমা জানান, আগে এ ধরনের সম্পত্তি মানুষের কাছে খুব একটা আকর্ষণীয় ছিল না। তবে জীবনযাত্রার ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় ২০২৫ সালের এক জরিপে দেখা গেছে, অর্ধেকের বেশি জাপানি এখন সস্তা হলে জিকো বুক্কেন ভাড়া নিতে রাজি।
রিউয়াও তার 'ভুতুড়ে ফ্ল্যাটমেটের' সঙ্গে বেশ সুখেই আছেন। তার মতে, 'আমি বিশ্বাস করি যে ভূতেরাও একসময় জীবিত মানুষ ছিল, তাই তারা আমাদের সম্মান পাওয়ার যোগ্য।'
সূত্র: বিবিসি
ডিবিসি/এসভিএন